স্থানীয় সংবাদ

লাল শাড়ি পরা মিতু বাড়ি ফিরল সাদা কাপড়ে মুড়ে

# কয়রায় নববধু মিতুর বাড়িতে কান্নার রোল : দাফন সম্পন্ন

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা)ঃ
পরনে ছিল লাল শাড়ি। ঐ লাল শাড়িতেই হয়েছিল বিয়ে। হাতে মেহেদির লাল টকটকে দাগ। বিয়ের আনন্দ মূহুর্তে পরিণত হয়েছে বিষাদে। কত আশা কত স্বপ্ন কত আনন্দ সব ম্লান করে দিল একটি সড়ক দুর্ঘটনা। কয়রার নাকশা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে লাল শাড়ী পরে রওনা দেয় মার্জিয়া আক্তার মিতু। আবার সেই বাড়িতে মিতু ফিরলো সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশ হয়ে। আর ঐ লাশ দেখেই স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে পুরো গ্রামটি। সে এক হৃদয় বিদায়ক ঘটনা। বাড়ির চারি পাশে শুধু কান্নার আওয়াজ। ঐ সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেছে ১৪ টি প্রাণ। বৃহস্পতিবার বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় খুলনার কয়রা উপজেলার নববধূ মিতু সহ একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন কয়রা উপজেলার নাকসা গ্রামের ছালাম মোড়লের মেয়ে নববধূ মার্জিয়া আক্তার মিতু (১৮), তার ছোট বোন লামিয়া (১১) এবং মিতুর দাদি রাশিদা বেগম (৭৫)। এ ঘটনায় এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪ টায় নববধু সহ তিন জনের লাশ পৌছায় তাদের বাড়িতে। ১৩ মার্চ সকাল ১০ টায় উত্তর নাকশা গ্রামেই তাদের জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শ্রেনী পেশার লোকজন সেখানে উপস্থিত হন। জানা শেষে পারিবারিক কবর স্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন হাফেজ আবু বকর ছিদ্দিক। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) বিকেল চারটার দিকে খুলনা–মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বোলাই ব্রিজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, গত বুধবার রাতে উপজেলার নাকসা গ্রামের সালাম মোড়লের মেয়ে মিতুর বিয়ে হয় রামপাল এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সাব্বির হোসেনের সঙ্গে। বৃহস্পতিবার সকালে নববধূ মিতু তার ছোট বোন লামিয়া ও বৃদ্ধা দাদি রাশিদা বেগমকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি রামপাল বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে মংলা থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসে থাকা নববধূ, বর ও তাদের স্বজনসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঐ দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতদের গ্রাম নাকসাসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাড়িতে স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার সকালে নিহত নববধুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার পিতা আঃ ছালাম কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল। তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে আর বলছে আমার মায়েরা কোথায়। আমি একটু তাদের দেখবো। তার কান্নায় উপস্থিত সকলের চোখে পানি এসে যায়। তার দুই মেয়ে আর নিজের মায়ের মুত্যুকে যেন মেনে নিতে পারছেনা তিনি। সালামের পিতা আগেই মারা যান। বেঁচে ছিল তার মা। দুই কন্যা আর এক মাত্র শিশু পুত্র ইসমাইলকে নিয়ে ছিল তার সব স্বপ্ন। ঐ বিয়ের গাড়িতে পুত্র ইসমাইল জোর করে উঠলেও জায়গা না থাকায় তাকে নামিয়ে নেওয়া হয়ছিল। তার আপদার মিটাতে সকালেই নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তাকে আর বরের বাড়িতে যাওয়া হলোনা। তার স্বজনরা তাকে বুঝানোর চেষ্ঠা করলেও বলছে আপা আর দাদি কই। মিতুর মা মুন্নি খাতুনের অবস্থা খুবই খারাপ। মেয়ে দুটি আর শাশুড়ের লাশ বাড়িতে আনার সঙ্গেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তিনি। মাঝে মাঝে চোখ দুটি একটু মেলানোর চেষ্টা করছে। তবে কিছু বলতে পারছেনা। এলাকার মানুষ তাকে সান্তনা দিয়েই চলেছে তাদের কিছু হয়নি। তাতে কি আর মানায় আগেই সে জানতে পারছিল তার মেয়েরা আর দুনিয়াতে নেই। ঐ সড়ক দুর্ঘটনায় মুন্নির মাতা ও নববধুর নানীও নিহত হয়েছে। তাকে দাকোপ উপজেলার পানখালী গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নিহত নববধূর চাচা মোফেজ মোড়ল বলেন, তার পরিবারেেক সান্তনা দেওয়ার মতো ভাষা নেই। এত বড় শোক কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়। নাকশা ডিএফ আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম বলেন, নিহত নববধু মিতুু তার মাদ্রাসার আলিম শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তার সরলতা পুরো শিক্ষকদের মন জয় করে নিতে পারছিল। তাকে হারিয়ে শিক্ষকরাও শোকে মাতোয়ারা। আমাদী ইউনিয়ন পরিষদর চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জুয়েল বলেন, ইতিপুর্বে এমন ঘটনা তার ইউনিয়নে আর কখনও ঘটেনি। পুরো ইউনিয়নের মানুষ শোকে স্তব্দ। নিহতদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ তদন্ত মোঃ শাহ আলম বলেন, ময়না তদন্ত শেষে নাকশা গ্রামে পারিবারিক কবর স্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button