ইসরাইলে একের পর এক ইরানের ‘ইমাদ’ ও ‘কদর’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অচল’ করে দেওয়ার হুমকি ইরানের
মিসাইল দেখে ভো-দৌড় ইসরাইলের প্রেসিডেন্টের
প্রবাহ ডেস্ক : ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ৭৮তম দফায় প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র চালানোর পর ইসরাইলে আঘাত হানার তথ্য সামনে আসছে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সকালে উত্তর ইসরাইলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর হাইফা শহরে একটি ক্লাস্টার বোমা (গুচ্ছ বোমা) একটি বাড়িতে আঘাত হেনেছে। এই হামলায় উত্তর ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার খবর পাওয়া গেছে। আইআরজিসি নতুন দফায় হামলার পর এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে,আবার তারা ইসরাইলে গুচ্ছ বোমা দিয়ে সাজানো কদর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইসরাইলের জরুরি সেবা সংস্থা মাগেন ডেভিড অ্যাডম জানায়, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো নিহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে তারা ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিয়েছে যিনি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের ওপর পা দিয়ে আহত হয়েছিলেন। এছাড়া নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় একজন নারী আঘাত পেয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়ায় তাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। আরেকটি ভয়ঙ্কর রাত দেখল ইসরাইল ঃ
কিছুক্ষণ আগে ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, তবে এটি একটি খোলা জায়গায় পড়ায় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী আগেভাগেই এটি শনাক্ত করে সতর্কতা জারি করেছিল, যার ফলে তেল আবিব এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিছু অংশে সাইরেন বেজে ওঠে। সোমবার (২৩ মার্চ) সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত চলা দীর্ঘ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ধারাবাহিকতায় এই সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটল। মূলত ইসরাইলের মধ্যাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়, যার ফলে জেরুজালেম, হাইফা, তেল আবিব এবং পশ্চিম গ্যালিলি এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে অন্তত একটিতে ক্লাস্টার বা গুচ্ছ ওয়ারহেড ছিল, যা থেকে ছোট ছোট অনেক বোমা ছড়িয়ে পড়ে। বন্দর নগরী হাইফার আশেপাশে এ ধরনের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ব্যাপক সতর্কতা জারি ঃ এর আগে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে জানিয়েছে, ইরান থেকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র আসার সংকেত পাওয়ার পর ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। সামরিক বাহিনী আরও জানায়, গত কয়েক মিনিটের মধ্যে হোম ফ্রন্ট কমান্ড সংশ্লিষ্ট এলাকার মোবাইল ফোনগুলোতে সরাসরি সতর্কতামূলক নির্দেশনা পাঠিয়েছে। জনসাধারণকে অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে প্রবেশ করতে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করতে বলা হয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করার পর আবার ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি নামাল তেহরান। আজ মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তাদের চলমান প্রতিশোধমূলক ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’-এর ৭৮তম ধাপের ঘোষণা দিয়েছে। নতুন দফায় ইসরাইলের ডিমোনা, তেল আবিব ও ইলাতের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি ওই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) এক বিবৃতিতে আইআরজিসি অভিযানের এই সর্বশেষ পর্যায়কে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা জানায়, যখন জাতি ‘মুষ্টিবদ্ধ হাতে’ লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে উপস্থিত হয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি ব্যাপক সমর্থন জানাচ্ছে, ঠিক তখনই শত্রুর লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষিত হয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সর্বশেষ পর্যায়টি ‘যুদ্ধের ইতিহাসে একটি অনন্য রেকর্ড স্থাপন করেছে’। বিবৃতি অনুযায়ী, দখল করা ইলাত বন্দর, সুরক্ষিত শহর ডিমোনা (যেখানে ইসরাইলি শাসকের কুখ্যাত পারমাণবিক চুল্লি অবস্থিত) এবং উত্তর তেল আবিবের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ইমাদ এবং মাল্টি-ওয়ারহেড কদর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং অ্যাটাক ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি এ নিয়ে দ্বিতীয়বার ডিমোনাতে আঘাত হানল। এর কয়েক দিন আগেই তারা একটি পাল্টা হামলা চালিয়েছিল, যা অধিকৃত অঞ্চলজুড়ে ভীতির সঞ্চার করেছিল। ওই হামলায় ডিমোনা এবং এর পাশের শহর আরাদে ২০০-এর বেশি মানুষ হতাহত হয়েছিল। আইআরজিসি আরও জানায়, তাদের অভিযানের ৭৮তম পর্যায়ে এ অঞ্চলে অবস্থিত বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। আঘাত-নির্ভর অভিযান ঃ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে, আইআরজিসি এই ঘৃণ্য ও শিশু হত্যাকারী আগ্রাসনকারীদের সঙ্গে আঘাত-নির্ভর অভিযানের মাধ্যমে কথা বলছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইআরজিসির অধিকাংশ কমব্যাট ইউনিট এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের লাখ লাখ বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেনি। সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, তাদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ সংঘাতকে আরও তীব্র করবে এবং আগ্রাসনকারীদের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলবে। আইআরজিসি আরও সতর্ক করেছে যে, প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে পরাজয় কাটিয়ে ওঠার বা যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা নজরে রাখা হবে। এতে বলা হয়েছে যে, যেকোনো পর্যায়ের আগ্রাসনের পরিকল্পনাকারী, বাস্তবায়নকারী এবং সমর্থকদের ওপর ইরানের ‘তীব্র আঘাত’ অত্যন্ত দ্রুত নেমে আসবে। গত মাসের শেষের দিকে ইরানবিরোধী সামরিক তৎপরতা শুরু হওয়ার পরপরই ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’ শুরু হয়।
সূত্র: প্রেস টিভি।
ইরানের মিসাইল দেখে দৌড়ে পালালেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট ঃ ইরানে যৌথভাবে আগ্রাসন চালাচ্ছে গণহত্যাকারী ইসরাইল ও তাদের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু করার পর থেকে নিস্তার পাচ্ছে না ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। কঠোরহস্তে পালটা হামলা করে যাচ্ছে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির দেশ। এতে প্রায় দিশাহারা হয়ে পড়েছে উগ্র ইহুদিবাদী ভূখ-টি। এর মধ্যেই ঘটে গেছে আরেক কা-; ইরানের মিসাইল দেখে ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের দৌড়ে পালানোর দৃশ্য সম্বলিত একটি ভিডিও রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গেছে। সোমবার (২৩ মার্চ) উত্তর ইসরাইলের কিরিয়াত শমোনা শহরে সংবাদ সম্মেলন করছিলেন অবৈধ এ ভূখ-ের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা শেষ করতেই ওই এলাকায় আঘাত হানে ইরানের একটি শক্তিশালী মিসাইল। সেই ক্ষেপণাস্ত্র দেখে সাংবাদিকদের রেখেই দৌড়ে পালান হারজগ। দ্রুত তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যায় তার সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা। এর আগে সংবাদ সম্মেলনে হারজগ বলেন, ইসরাইল গত বছরের যুদ্ধবিরতিতে ফিরে যেতে পারে না এবং তাদের অবশ্যই লেবাননের ভেতরে ‘কৌশলগত গভীরতা’ নিশ্চিত করতে হবে। ইরানের মিসাইলের আঘাতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মৃত্যুর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায় না। এতে তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মাঝে মধ্যে পরিদর্শনে যান প্রেসিডেন্ট হারজগ। কিরিয়াত শমোনা শহরে সেরকমই একটি সফর শেষে সংবাদ সম্মেলন করছিলেন তিনি। ওই সময় সেখানে আঘাত হানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র।
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অচল’ করে দেওয়ার হুমকি ইরানের : ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অচল’ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে আরব উপসাগরে থাকা সব মার্কিন জাহাজকে ডুবিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
মঙ্গলবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও দেশটির প্রভাবশালী ‘এক্সপেডিয়েন্সি ডিসসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য মহসেন রেজায়ি ওই হুমকি দিয়েছেন।
আইআরজিসি এই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষার শেষ সময় ঘনিয়ে আসছে এবং এই অচলাবস্থা থেকে তাদেরকে উদ্ধার করার জন্য খুব বেশি সময় বাকি নেই।’
কবে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অচল’ করে দেওয়ার জন্য কী পদক্ষে নেওয়া হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি মহসেন রেজায়ি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে পাঁচ দিন কোনও হামলা চালানো হবে না। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসফাহানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।
ইরানের আধাসরকারি সংবাদসংস্থা ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসফাহান প্রদেশ এবং খোরমশহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল।
আল-জাজিরা জানিয়েছে, ইসফাহান প্রদেশের একটি গ্যাস উৎপাদন সংস্থায় হামলা চালানো হয়েছে। ওই সংস্থাটি ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ওই সংস্থার আশপাশে বসতি এলাকার একাংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় খোরমশহরের বিদ্যুৎকেন্দ্রের উপর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ইরাক এবং কুয়েতের সীমান্তলাগোয়া এই শহরে হামলা ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল বলে মনে করা হচ্ছে।
ফার্স নিউজে আরও দাবি করা হয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে ইরানের দু’টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। যদিও ইরানের এই দাবি নিয়ে এখনো মুখ খোলেনি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল। দুই দেশের কেউই এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
প্রসঙ্গত, সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতেই আগামী পাঁচ দিনের জন্য ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেন তিনি।
এর আগে গত শনিবার হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে হামলা চালানোর হুমকি দেন ট্রাম্প। ৪৮ ঘণ্টা সময়ও বেঁধে দেন। সোমবার সেই সময়সীমা শেষ হয়।
সূত্র: আলজাজিরা



