ইরানের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিপর্যস্ত তেল আবিব

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ মানসিকভাবে ভেঙে পঙছে ইহুদীরা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ধস! সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এক নতুন এবং ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে পরিচালিত বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ইসরায়েলের প্রাণকেন্দ্র তেল আবিবসহ অন্যান্য প্রধান শহরগুলোকে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভিডিওর তথ্যানুযায়ী, ইসরায়েলের এক সময়ের গর্বিত ও “অজেয়” বলে পরিচিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তেল আবিবে আগুনের লেলিহান শিখা ও ধ্বংসযজ্ঞ। রাতের অন্ধকারে তেল আবিবের আকাশ বারবার সাইরেন আর বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠছে। ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, আবাসিক ভবন এবং রাস্তায় ভয়াবহ আগুনের সৃষ্টি হচ্ছে। পুড়ে যাওয়া গাড়ি, চুরমার হয়ে যাওয়া জানালা এবং ধসে পড়া ভবনের প্রবেশপথগুলো এখন ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের নিত্যদিনের দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্লাস্টার ওয়ারহেডের ব্যবহার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা। এই হামলার সবচেয়ে ভীতিজনক দিক হলো ইরানের “ক্লাস্টার স্টাইল” ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আকাশে ধ্বংস হওয়ার পরিবর্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেকগুলো সাব-মিউনিশনে বিভক্ত হয়ে বড় এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন আয়রন ডোম) বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। একটি লক্ষ্যের বদলে অসংখ্য দ্রুতগামী টুকরো সামলানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। চরম আতঙ্ক ও মানসিক বিপর্যয় ঃ ইসরায়েলি নাগরিক ইহুদিদের মধ্যে এখন কাজ করছে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য ও মিডিয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে যা দাঁঙায় তাতে স্পষ্ট বর্ণনা করা যায় কীভাবে পরিবারগুলো রাতের পর রাত বাঙ্কার বা মাটির নিচের আশ্রয়কেন্দ্রে কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে পারছে না। সাইরেন থামলেও ভয় কাটছে না, কারণ অবিস্ফোরিত ক্ষেপণাস্ত্রের অংশগুলো রাস্তাঘাট ও শিশুদের খেলার মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকছে। এই দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা ইসরায়েলিদের মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে, যা তাদের দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও অবকাঠামোগত চাপ ঃ তেল আবিব কেবল একটি জনবসতি নয়, এটি ইসরায়েলের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রাণকেন্দ্র। বারবার হামলা ও সতর্কসংকেতের কারণে অফিস-আদালত বন্ধ রাখতে হচ্ছে, গণপরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং খুচরা ব্যবসা বাণিজ্যে ধস নেমেছে। অবকাঠামো মেরামত করতে গিয়ে দেশটির জরুরি পরিষেবাগুলো হিমশিম খাচ্ছে। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষতির এই মাত্রা ইসরায়েলকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ইসরায়েল এখন আর সুরক্ষিত কোনো দেশ নয়। ইরানের কৌশলী ও ধারাবাহিক হামলা তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক দম্ভকে চুরমার করে দিয়েছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পাওয়ায় ইসরায়েলি সরকার এবং সেনাবাহিনী এখন দিশেহারা। তারা বুঝতে পারছে যে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ দিয়ে এই স্তরের সংঘাত সামলানো তাদের পক্ষে দীর্ঘ সময় সম্ভব নয়। পুরো দেশ এখন এক ধরণের “অবরুদ্ধ” মানসিকতার মধ্যে বাস করছে, যেখানে যেকোনো মুহূর্তে আকাশ থেকে মৃত্যু নেমে আসার ভয়ে সবাই তটস্থ। মধ্যপ্রাচ্যে ৩৫ বছরের আধিপত্য ধুলিস্যাৎ, পিছু হটছে ওয়াশিংটন: ইরাক ছাড়ার জরুরি নির্দেশ, তেহরান-বাগদাদ মৈত্রীতে দিশেহারা যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ কয়েক দশকের (৩৫ বছর) আধিপত্য কি তবে শেষের পথে? ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। রাজধানী বাগদাদে মার্কিন স্বার্থে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় মার্কিন নাগরিকদের অবিলম্বে ইরাক ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মার্কিন দূতাবাস এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শক্তিশালী আক্রমণের সম্ভাবনা দেখছে মার্কিন গোয়েন্দারা। মার্কিন ভীতি ও দূতাবাসের সতর্কতা ঃ বাগদাদের গ্রিন জোনে অবস্থিত সুরক্ষিত মার্কিন দূতাবাস থেকে জারি করা এক জরুরি সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, মার্কিন নাগরিকদের উচিত অতি দ্রুত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ইরাক ত্যাগ করা। দূতাবাসের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা এখন আর তাদের নেই। মূলত ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং কৌশলী হামলার সামনে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন কার্যত কোণঠাসা। ওয়াশিংটন এখন এতটাই ভীত যে, তারা নাগরিকদের কোনোভাবেই দূতাবাস বা কনসুলেটের ধারেকাছে না আসার পরামর্শ দিয়েছে। ইরাক-ইরান অক্ষশক্তি: মার্কিন আধিপত্যের পতন ঃ এই পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ইরাকের সাধারণ মানুষ এবং শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ইরানের দিকে ঝুঁকে পড়া। এক সময় সাদ্দাম পরবর্তী ইরাককে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে রাখার যে নীল-নকশা ওয়াশিংটন তৈরি করেছিল, তা আজ ধূলিসাৎ। ইরাকি জনগণের একটি বড় অংশ এখন বিশ্বাস করে, মার্কিন সেনারা তাদের নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং শোষণের জন্য অবস্থান করছে। অন্যদিকে, ইরাকের ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফ্রন্ট’ এর মতো দলগুলো এখন সরাসরি ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। এই নতুন অক্ষশক্তি শুধু যে সামরিকভাবে শক্তিশালী তা নয়, বরং তারা বাগদাদের রাজপথ এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে মার্কিন ড্রোন বা বিমান হামলা এখন আর তাদের দমাতে পারছে না। বরং মার্কিন হামলার জবাবে মার্কিন সাংবাদিক শেলী কিন্ডসনের অপহরণ এবং দূতাবাসের চারদিকে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে ওয়াশিংটন এখন আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে চলে গেছে। ‘র্যাটলড’ ওয়াশিংটন: সময় ফুরিয়ে আসছে ঃ বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন এই সতর্কতা কোনো সাধারণ রুটিন মাফিক ঘোষণা নয়, বরং এটি তাদের চরম উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী মার্কিন অপহৃতদের খুঁজে পেতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা প্রমাণ করে বাগদাদের ওপর থেকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ কতটা শিথিল হয়ে পড়েছে। ৪৮ ঘণ্টার যে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে, তা কার্যত মার্কিন প্রশাসনের অসহায়ত্বকেই প্রকাশ করছে। ইরাকের মাটি থেকে মার্কিনদের বিদায় নেওয়ার এই যে সুর ধ্বনিত হচ্ছে, তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিনদের ক্রমহ্রাসমান ক্ষমতার এক স্পষ্ট চিত্র।



