জাতীয় সংবাদ

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতদের ৯২ শতাংশই শিশু

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ রোগী শনাক্ত ও আক্রান্তের সমন্বিত তথ্য না থাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। আর এর মধ্য দিয়েই আবারও সামনে এসেছে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা। একইসঙ্গে টিকাদান কর্মসূচির জন্য দাতা সংস্থার অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন পর দেশজুড়ে হঠাৎ বাড়তে থাকা হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রোগ শনাক্তে ধীরগতি এই উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বেশিরভাগই উপসর্গ নিয়ে ‘সন্দেহজনক’ হামে প্রাণ হারাচ্ছে। আর মৃতদের মধ্যে ৯২ শতাংশই শিশু। এ অবস্থায় হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার এরইমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ৫৬টি জেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। এর আওতায় ৩০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যক্রম জোরদার, হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। হামের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জনসাধারণকে জানাতে ইনফোগ্রাফিক ও জনসচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হচ্ছে। কিন্তু রোগী শনাক্ত ও আক্রান্তের সমন্বিত তথ্য না থাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। আর এর মধ্য দিয়েই আবারও সামনে এসেছে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা। একইসঙ্গে টিকাদান কর্মসূচির জন্য দাতা সংস্থার অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি চালু হওযার পর দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্য ছিল না বললেই চলে। বিশেষ করে ২০২০ সাল থেকে দেশে হামে মৃত্যুর কোনো রেকর্ড নেই। হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ টিকাদান কর্মসূচির কভারেজ ধস। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে টিকাদানের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২ সালে তা উঠে যায় ১০৩ দশমিক ৬ শতাংশে। ২০২৪ সালে নেমে আসে ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশে। আর ২০২৫ সালে বড় ধস নেমে তা দাঁড়ায় ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকারি হিসাবে ১৫ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ২১ জন, আর একই সময়ে ‘সন্দেহজনক হাম’ বা হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১২৮ জনের। এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন জেলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছেÑমৃতদের মধ্যে প্রায় ৯২ দশমিক ৮৬ শতাংশই শিশু, যাদের বড় একটি অংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন হাজারো রোগীর বেশিরভাগও শিশু হওয়ায় পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি সতর্কবার্তা দিচ্ছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীর পাঁচটি হাসপাতালসহ ৬৪টি জেলায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মৃতদের মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশের বয়স শূন্য থেকে ৫ বছর এবং ১২ দশমিক ২৬ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১৮ বছর। বাকি ১৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক। আর সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রোগীর মধ্যে বেশিরভাগই শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা নয় হাজার ৮৮৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ২২৪ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা এক হাজার ৩৯৮ জন। এসময়ে সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ছয় হাজার ৮৮৩ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে চার হাজার ৬৩৫ জন। মৃত্যুর হিসাবে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে সবচেয়ে বেশি ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। একই সময়ে জেলার তালিকাতেও ঢাকায় সর্বোচ্চ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর হাসপাতালের চিত্র (৬ এপ্রিল পর্যন্ত) ঃ রাজধানীর পাঁচটি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে বাংলানিউজ। এর মধ্যে মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে হাম-সংক্রান্ত জটিলতায় মারা গেছে ৩ শিশু। এখানে রোগী ভর্তি রয়েছে ২৭৭। মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও হাম রোগীদের জন্য একটি ওয়ার্ড নির্ধারিত হয়েছে। যেখানে ভর্তি আছে ৪২ জন। এখানে কারো মৃত্যু হয়নি। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মার্চ ও এপ্রিল মাসে ৮০৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৮ জন মারা গেছে। বর্তমানে ৬২ শিশু চিকিৎসাধীন। শহীদ সোহরাওয়াার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, বর্তমানে হাম আক্রান্ত ১০০ জন চিকিৎসাধীন। আক্রান্ত সবাই শিশু। যাদের বেশিরভাগের বয়স এক বছরের নিচে। হাম আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে ২ শিশুর। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৬১ শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। এ হাসপাতালে এ পর্যন্ত চার শিশু মারা গেছে। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল হক বলেন, ৬০টি বিশেষ শয্যায় রোগী ভর্তি আছে। এর বাইরে একক কেবিন, আইসোলেশন ওয়ার্ডেও শিশুদের ভর্তি করতে হচ্ছে। যে শিশুদের ভর্তি না করলে অন্য হাসপাতালে যেতে যেতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে, তাদের ফিরিয়ে দেওয়ারও উপায় থাকে না। রাজধানীর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড) ছাড়া সব হাসপাতালে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সব মেডিকেল কলেজ ও সব সরকারি হাসপাতালে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড চালু হয়েছে। যেসব জেলায় মৃত্যু হয়েছে ঃ টাঙ্গাইল জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশু মারা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ১৩ মাস বয়সী সাফা এবং ৮ মাস বয়সী সাইফান। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালে ২৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য পাওয়া যায়নি। ময়মনসিংহ জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে সাত শিশু মারা গেছে। এসব শিশুর ৯০ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। হামে আক্রান্ত হয়ে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছে ১৮১ জন। রাজশাহী বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ১১ শিশু মারা গেছে। হামে আক্রান্ত ও হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৯৬২ জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায় রোগীর সংখ্যা বেশি। এ দুই জেলায় আক্রান্তদের মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সের শিশুর সংখ্যা বেশি। বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১০ মাস বয়সী এক শিশু। কিন্তু শিশুটির শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহের জন্য অভিভাবকদের সম্মতি না পাওয়ায় পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. খুরশিদ আলম জানান, গত এক মাসে উপজেলার ৩৬ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে হামের রোগীদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু রয়েছে। সেখানে ১০ শিশু চিকিৎসাধীন। নাটোরে হামে আক্রান্ত হয়ে কাসফি নামে ৩ মাস বয়সী এক ছেলে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ জেলায় সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯ জন। নওগাঁ জেলায় এখন পর্যন্ত এক ছেলে শিশু মারা গেছে। নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই জন।
দেড় দশকে দেশে হামে সর্বোচ্চ মৃত্যু, বেশি মৃত্যুহারও চলতি বছরে হামে যত মৃত্যু হয়েছে, তা গত দেড় দশকে সর্বোচ্চ। এ সময়ে পাঁচবার হামে মৃত্যুর ঘটনা জানা যায়। ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি মারা যায় ১০ জন। ডব্লিউএইচওর দেওয়া বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশে ৯ হাজার ৭৪৩টি হাম রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। পরের বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৯৩৪ জনে। এরপর ২০০৬ সালে তা নেমে আসে ৬ হাজার ১৯২-এ। ২০০৭ সালে ২ হাজার ৯২৪, ২০০৮-এ ২ হাজার ৬৬০, ২০০৯-এ ৭১৮, আর ২০১০ সালে ৭৮৮। অর্থাৎ ২০০৪ থেকে ২০০৫-এর ভয়াবহ অবস্থার পর আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত কমে আসে। ২০১১ সালে দেশে হাম রোগীর সংখ্যা আবার লাফ দিয়ে ৫ হাজার ৬২৫-এ ওঠে। ২০১২ সালে তা ১ হাজার ৯৮৬-এ নেমে আসে। ২০১৩ সালে ২৩৭, ২০১৪ সালে ২৮৯, ২০১৫ সালে ২৪০-এ তিন বছর তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে আবার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয় ৯৭২।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button