এসএসসিতে থাকছে নজিরবিহীন কড়াকড়ি : জেলসহ তিন স্তরে শাস্তির বিধান

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ আগামীকাল (২১ এপ্রিল) থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বেশকিছু কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। নির্দেশনা অনুযায়ী, নিজস্ব ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই এমন কেন্দ্রে ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। ব্যবহারিক পরীক্ষার মূল্যায়নেও আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। এছাড়া পরীক্ষার হলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ২০ ধরনের সম্ভাব্য অপরাধ চিহ্নিত করে জেল ও বহিষ্কারসহ তিন স্তরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। যা কার্যকর করতে মাঠ পর্যায়ে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে ভিজিল্যান্স টিম নামানো হচ্ছে। ব্যবহারিক পরীক্ষায় কড়াকড়ি, নকল রুখতে ‘জিরো টলারেন্স’ঃ এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ব্যবহারিক অংশে স্বচ্ছতা ফেরাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা। বিগত বছরগুলোতে ব্যবহারিক পরীক্ষায় শৈথিল্য প্রদর্শন বা ‘গড়পড়তা’ নম্বর দেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা বন্ধ করতে এবার কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে পরীক্ষায় অংশ নিয়েই নম্বর অর্জন করতে হবে। কেন্দ্র সচিবদের জানানো হয়েছে, তাত্ত্বিক পরীক্ষা যে কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে, ব্যবহারিক পরীক্ষাও সেই কেন্দ্রেই নিতে হবে। এছাড়া স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরীক্ষক নিয়োগে আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। কোনোভাবেই নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষককে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বহিরাগত পরীক্ষক’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এছাড়া পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দ ডাকযোগে না পাঠিয়ে সরাসরি বোর্ডে এসে হাতে হাতে জমা দিতে হবে। এই নিয়মে অবহেলা করলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পরীক্ষার হলে নকলের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা হচ্ছে। এর আওতায় ২০টি সুনির্দিষ্ট অপরাধের তালিকা করে শাস্তিকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম স্তর : পরীক্ষা কক্ষে কথা বলা, ডেস্কে বা পোশাকে কোনো কিছু লেখা থাকা, ক্যালকুলেটরে তথ্য লুকিয়ে রাখা কিংবা মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস সঙ্গে রাখলে এ বছরের পরীক্ষা বাতিল করা হবে। দ্বিতীয় স্তর : যদি কোনো পরীক্ষার্থী প্রশ্ন বা উত্তরপত্র হলের বাইরে পাচার করে, কক্ষ প্রত্যবেক্ষককে হুমকি প্রদান করে কিংবা উত্তরপত্র জমা না দিয়ে হল ত্যাগ করে, তবে তার ওই বছরের পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী এক বছরের জন্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হবে। তৃতীয় স্তর : অন্যের হয়ে পরীক্ষা দেওয়া (প্রক্সি), রোল বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা, উত্তরপত্র বিনিময় করা এবং কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের শারীরিকভাবে আক্রমণ কিংবা অস্ত্রের প্রদর্শন করার মতো ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীকে সরাসরি দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হবে। একইসঙ্গে এসব গুরুতর অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করা হবে। এখন থেকে সৃজনশীল (সিকিউ) ও বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) পরীক্ষার মধ্যে কোনো বিরতি থাকবে না। ১০০ নম্বরের পরীক্ষার ক্ষেত্রে ৩০ নম্বরের এমসিকিউ-এর জন্য ৩০ মিনিট এবং ৭০ নম্বরের সৃজনশীল অংশের জন্য ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হয়েছে। পরীক্ষায় যেকোনো ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতি বা অসদুপায় রোধে এবার বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হচ্ছে ‘ভিজিল্যান্স টিম’। ডিজিটাল নজরদারি এড়ানোর সব পথ বন্ধ করতে এই টিমকে যেকোনো সময় পরীক্ষা কেন্দ্রে ঝটিকা অভিযান চালানোর পূর্ণ এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। অভিযানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা শনাক্ত হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। নতুন সময়সূচি ও আসন বিন্যাসে আমূল পরিবর্তন। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড থেকে প্রকাশিত নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সময় বিভাজনে নতুন নিয়ম কার্যকর হতে যাচ্ছে। এখন থেকে সৃজনশীল (সিকিউ) ও বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) পরীক্ষার মধ্যে কোনো বিরতি থাকবে না। ১০০ নম্বরের পরীক্ষার ক্ষেত্রে ৩০ নম্বরের এমসিকিউ-এর জন্য ৩০ মিনিট এবং ৭০ নম্বরের সৃজনশীল অংশের জন্য ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে ব্যবহারিক আছে এমন বিষয়গুলোতে ২৫ নম্বরের এমসিকিউ-এর জন্য ২৫ মিনিট এবং ৫০ নম্বরের সৃজনশীলের জন্য শিক্ষার্থীরা ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট সময় পাবেন। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, অটিস্টিক বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে অতিরিক্ত ৪৫ মিনিট সময় বেশি পাবেন এবং নিয়ম অনুযায়ী তারা চাইলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শ্রুতিলেখক সঙ্গে রাখতে পারবেন। পরীক্ষার হলে নকলমুক্ত পরিবেশ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আসন বিন্যাসেও আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। বোর্ডের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা প্রতি বেঞ্চে সর্বোচ্চ ২ জন এবং ৪ ফুট লম্বা বেঞ্চে মাত্র ১ জন পরীক্ষার্থী বসতে পারবে। একই বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের পরস্পরের কাছাকাছি আসন বরাদ্দ দেওয়া যাবে না এবং কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নিজস্ব কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে পারবে না। এছাড়া হলে সুষ্ঠু তদারকির জন্য প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে একজন করে কক্ষ প্রত্যবেক্ষক রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যবহারিক পরীক্ষা নিয়ে অতীতে নানা অভিযোগ আমাদের কানে এসেছে। এবার আমরা সেই সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছি। আমরা স্পষ্ট বলে দিয়েছি, যে কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা নেই, সেখানে কোনো ব্যবহারিক পরীক্ষা হবে না। এবারের প্র্যাকটিক্যাল হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং মেধার ভিত্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনে শিক্ষকদের জন্যও থাকছে কড়া হুঁশিয়ারি। ওএমআর শিট বা উত্তরপত্রের কভার পৃষ্ঠার তথ্যে কোনো ভুল বা গরমিল পাওয়া গেলে এবং এতে কক্ষ প্রত্যবেক্ষকের অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বোর্ড। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, ব্যবহারিক পরীক্ষা নিয়ে অতীতে নানা অভিযোগ আমাদের কানে এসেছে। এবার আমরা সেই সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছি। আমরা স্পষ্ট বলে দিয়েছি, যে কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা নেই, সেখানে কোনো ব্যবহারিক পরীক্ষা হবে না। এবারের প্র্যাকটিক্যাল হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং মেধার ভিত্তিতে। তিনি বলেন, ব্যবহারিক পরীক্ষায় ‘গড়পড়তা’ নম্বর দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া পরীক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও আমরা কঠোরতা অবলম্বন করছি, যেন কোনো শিক্ষক নিজ স্কুলের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে না পারেন। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, তাত্ত্বিক পরীক্ষার মতো ব্যবহারিকেও প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। কোনো পরীক্ষার্থী যদি অসদুপায় অবলম্বন করে বা হলের শৃঙ্খলা বিঘিœত করে, তবে তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না উল্লেখ করে প্রফেসর কামাল উদ্দিন আরও বলেন, শিক্ষক-পরীক্ষার্থীসহ প্রত্যেককে বোর্ডের সব নীতিমালা মেনে চলতে হবে। একটি সুন্দর পরীক্ষার আয়োজন করতে আমরা ভিজিল্যান্স টিমসহ মাঠ পর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকছি।



