স্থানীয় সংবাদ

জীবন সংগ্রামে হারিয়ে যাচ্ছে উপকুলের শিশুদের শিক্ষার স্বপ্ন

আজ মহান মে দিবস

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) ঃ কি আর করবো সংসারের অভাব, রোজগারের লোকজন নেই তাই বাধ্য হয়েই সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেতে হয়। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেই চলে আমাদের জীবন এমন কথাগুলো বলছিলেন উপকূলীয় জনপদ কয়রার ৫নং কয়রা গ্রামের শিশু যোদ্ধা আলমগীর। শুধু আলমগীর নয় এমন অনেক শিশু শ্রমের বিনিময় সংসার চালায় এই জনপদে। যে বয়সে তাদের বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা সেই বয়সে কাদের হাতে উঠছে জাল নৌকা আর বৈঠা। এ সবের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের শিক্ষার স্বপ্ন। কপোতাক্ষ ও শাকবাড়ীয়া নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করেই কাটে খুলনার কয়রা উপজেলার উপকূলীয় শিশুদের জীবন। যেখানে শৈশবে বইখাতা হাতে থাকার কথা, সেখানে অনেক শিশুর হাতে এখন জাল, দড়ি আর কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম। দারিদ্র্য, অভাব ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে উপকূলের শত শত শিশু আজ শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুন্দরবনঘেঁষা এই অঞ্চলে বহু পরিবারের দৈনন্দিন সংগ্রাম এতটাই কঠিন যে, শিশুদের পড়াশোনা ও খেলাধুলা প্রায় বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। তারা শ্রম বিক্রি করেই তাদের সংসার চালায়। উপজেলার গোবরা গ্রামের দুই ভাই যুবায়ের হোসেন ও সুমন হোসেনের জীবন সেই কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচিত্র। বাবা অন্যত্র সংসার করায় অসুস্থ মায়ের সঙ্গে তাদের জীবন কষ্টে কাটছে। বর্তমানে তারা পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হলেও সংসার চালাতে নদী থেকে কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে। প্রতিদিন কাঁকড়া সংগ্রহ করে অল্প দামে বিক্রি করেই চলে তাদের সংসার ও মায়ের চিকিৎসা। একই এলাকার হাসান ও হোসেন নামের দুই ভাইয়ের গল্পও প্রায় একই। বাবার মৃত্যুর পর অসুস্থ মায়ের ভরসায় বড় হওয়া এই দুই ভাই পড়াশোনা ছেড়ে সংসারের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের ভাষায়, “ঠিকমতো তিনবেলা খাবারই জোটে না, স্কুলে যাবো কীভাবে?” ‘দারিদ্র্েযর কারণে ভেঙে যাচ্ছে শিশুদের স্বপ্ন’ স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, দারিদ্র্েযর কারণে উপকূলের অনেক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছেÑমাছ ধরা, রেণুপোনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ইটভাটার শ্রম পর্যন্ত। এতে শিশু অধিকার বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কয়রার কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ, ম, আঃ বলেন, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাবে শিশুরা শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে। টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা ও কার্যকর নীতিমালা ছাড়া এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। কয়রা উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব নুরুল আমিন বাবুল বলেন, দারিদ্র্েযর কারণে শিশুদের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ ছাড়া এই প্রজন্ম আরও পিছিয়ে পড়বে। সেই জন্য সরকারিভাবে তাদের পরিবারকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। কয়রা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, অভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। তাদের শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। সব মিলিয়ে, উপকূলের শিশুদের শৈশব আজ বইখাতা নয়; বরং কঠিন জীবনসংগ্রামের ভারে তাদের শিক্ষার স্বপ্ন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তারাও শিক্ষায় আলোকিত হোক এটিই সকলের চাওয়া।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button