নতুন মাইল ফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে ‘খুলনাঞ্চলের’ আম

বিক্রির টার্গেট ৫৬৩ কোটি টাকা
১০০ মেট্রিক টন বিদেশে রপ্তানীর সম্ভাবনা
সংগ্রহ ও বাজারজাত শুরু হচ্ছে আজ থেকে
মোঃ আশিকুর রহমান : মধুমাসের জনপ্রিয় ও রসালো ফল ‘আম’। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে খুলনাঞ্চলের ৪ জেলায় আমের আবাদ হয়েছে ৭ হাজার ৭৫৩ হেক্টর জমিতে। গত বছর ছিল ৭ হাজার ৭৪০ হেক্টর। চলতি বছরে আম চাষাবাদের আবাদ বেড়েছে ১৩ হেক্টরের বেশি। বড় কোনো ধরনের আবহাওয়ার প্রতিকূলতা (বিশেষ করে শিলাবৃষ্টি) দেখা না দিলে এ অঞ্চলে আমের সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। চলতি বছরে উৎপাদিত আম বিক্রির টার্গেট রয়েছে ৫৬৩ কোটি ৫০ লাখ ১৫ হাজার ৮৩১ টাকা (প্রতি কেজি গড় ৫০ টাকা দরে)। এছাড়া ১০০ মেট্রিক টন আম বিদেশের বাজারে রপ্তানী হতে পারে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রে জানা গেছে, খুলনাঞ্চলের ৪ জেলায় উৎপাদিত আম বিশেষ করে চলতি বছরে সাতক্ষীরা জেলার অপরিপক্ক আম সংগ্রহ ও বাজারজাত ঠেকাতে আম সংগ্রহের ক্যালেন্ডার (সময়সূচি) ঘোষণা করেছে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন। নির্ধারিত সময়ের আগে আম সংগ্রহ বা বিক্রি ঠেকাতে আইনরক্ষাকারী বাহিনী ও কৃষি বিভাগের সহয়তায় কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আম সংগ্রহের ক্যালেন্ডার (সময়সূচি) অনুসারে, আজ ৫ মে (মঙ্গলবার) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাসসহ বিভিন্ন বৈশাখী এবং স্থানীয় জাতের আম সংগ্রহ ও বাজারজাত শুরু হচ্ছে। হিমসাগর আম বাজারে আসবে ১৫ মে হতে। ল্যাংড়া আমের জন্য আপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন, আগামী ২৭ মে থেকে সংগ্রহ ও বাজারজাত শুরু হবে। এছাড়াও আগামী ৫ জুন থেকে আ¤্রপালি সংগ্রহ ও বাজারজাত শুরু হবে বলে তথ্যসূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে শিলাবৃষ্টি দেখা না দিলে এই অঞ্চলের আম চাষিরা চলতি অর্থবছরে আম উৎপাদনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে এবং অঞ্চলের উৎপাদিত আম দেশের মানুষের পুষ্টিগুণের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজারজাতকরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধিসহ বিদেশী রেমিট্যান্স অর্জণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চলের তথ্যানুসারে, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে খুলনাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে আমের আবাদ হয়েছে ৭ হাজার ৭৫৩ হেক্টর জমিতে, যা গত অর্থবছরে ছিল ৭ হাজার ৭৪০ হেক্টর। চলতি বছরে আমের আবাদ বেড়েছে ১৩ হেক্টর বেশি জমিতে। অঞ্চলে আমের সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। যার মধ্যে খুলনা জেলায় আমের আবাদী জমির পরিমান ১ হাজার ৪৯২ হেক্টর, সম্ভাব্য উৎপাদনের টার্গেট ১৯ হাজার ২৪৫ মেট্রিক টন। উৎপাদনের বিপরীতে বিক্রির টার্গেট ৯৬ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বাগেরহাট জেলায় আমের আবাদী জমির পরিমান ১ হাজার ৫৭৯ হেক্টর, সম্ভাব্য উৎপাদনের টার্গেট ১৫ হাজার ৪৩০ মেট্রিক টন। উৎপাদনের বিপরীতে বিক্রির টার্গেট ৭৭ কোটি ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৩১ টাকা। সাতক্ষীরা জেলায় আমের আবাদী জমির পরিমান ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর, সম্ভাব্য উৎপাদনের টার্গেট ৭০ হাজার ৯৬৫ মেট্রিক টন। উৎপাদনের বিপরীতে বিক্রির টার্গেট ৩৫৪ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও নড়াইল জেলায় আমের আবাদী জমির পরিমান ৫৪২ হেক্টর, সম্ভাব্য উৎপাদনের টার্গেট ৭ হাজার ৬০ মেট্রিক টন। উৎপাদনের বিপরীতে বিক্রির টার্গেট ৩৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
খুলনাঞ্চলের ৪ জেলায় বিশেষ করে সাতক্ষীরার আম চাষিরা সম্প্রতি আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ নিয়ে চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তর হতে আম চাষিদের আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের বিষয়ে সার্বিক পরামর্শ প্রদানসহ সকল ধরনের সহযোগীতা করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলার সদর উপজেলার ব্রক্ষরাজপুর ব্লকের ভোমরাজপুর গ্রামের আম চাষী মো. সেলিম প্রবাহকে জানান, এ বছর ২০ বিঘা জমিতে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, ল্যাংড়া, আ¤্রপালিসহসহ কয়েক জাতের আমের আবাদ করেছি, ফলন খুব ভালো হয়েছে। গাছে প্রচুর পরিমাণে আম ধরেছে। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে ভালো দামে বিক্রি করতে পারবো। আজ মঙ্গলবার (৫ মে) থেকে গাছের আম ভাঙ্গা শুরু করা হবে। তাছাড়া কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত খোঁজ খবর নিচ্ছেন। পাশপাশি বক্ল সুপারভাইজারও নিয়মিত আসছেন নানাবিধ পরামর্শ দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (কেরালকাতা ও নাকিলা ব্লক) মৃণাল কান্তি ম-ল প্রবাহকে জানান, আমার দুই ব্লকে প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এখানে ১২শ’র অধিক আম চাষী রয়েছে। আম চাষীরা যেন অপরিপক্ক আম সংগ্রহ না করে (না ভাঙ্গে) এবং আমের ছিদ্রকারী পোকা ও মাছি পোকার আক্রমণ থেকে আমকে বাঁচাতে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে অপরিপক্ক আম সংগ্রহ থেকে কৃষকদের বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলার সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (ব্রক্ষরাজপুর ব্লক) সুমন কুমার সাহা জানান, আমার ব্লকে ৮০ হেক্টর আমের আবাদ হয়েছে। এখানে ২শতাধিক আম চাষী রয়েছে। আম চাষীরা যেন অপরিপক্ক আম সংগ্রহ না করে (না ভাঙ্গে) এবং ছিদ্রকারী আমকে বাঁচাতে ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে অপরিপক্ক আম সংগ্রহ থেকে কৃষকদের বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। সময়সীমানুসারে আজ (মঙ্গলবার) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আম সংগ্রহ ও বাজারজাত শুরু হচ্ছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরার আম বিদেশে রপ্তানী হয়ে থাকে,তাই অপরিপক্ক আমের কারনে যে সুনাম নষ্ট না হয়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মো. আসাদুজ্জামান প্রবাহকে জানান, চলতি অর্থ বছরে এই উপজেলায় ৬৫৮ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ১১ হাজার ১৮৬ মেট্রিক টন। ইতোমধ্যে আমের ক্যালেন্ডার অনুসারে আজ ৫ মে (মঙ্গলবার) হতে আনুষ্ঠানিকভাবে আমের সংগ্রহ ও বাজারজাত শুরু হচ্ছে। আম চাষীরা যেন অপরিপক্ক আম কোনো অবস্থাতে সংগ্রহ না করে তার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের আগে কোনো আম সংগ্রহ বা বিক্রি ঠেকাতে আইন রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় আমরা কঠোর নজরদারি করছি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. মনির হোসেন প্রবাহকে জানান, চলতি অর্থবছরে আমার উপজেলায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। আমের সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। সময়সূচি অনুসারে আজ ৫ মে (মঙ্গলবার) হতে আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েকটি জাতের আমের সংগ্রহ ও বাজারজাত শুরু হচ্ছে। আম চাষীরা যেন অপরিপক্ক আম কোনো অবস্থাতে সংগ্রহ না করে এবং আমকে পোঁকা-মাড়কের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে চাষীদের কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে চলতি বছরে এ উপজেলায় আম উৎপাদন ও বিক্রিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, চলতি অর্থবছরে আমার উপজেলায় ৮৯ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ টার্গেট দেয়া হয়েছে। সময়সূচি অনুসারে ৫ মে (মঙ্গলবার) হতে আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েকটি জাতের আমের সংগ্রহ ও বাজারজাত শুরু হচ্ছে। আম চাষীরা যেন অপরিপক্ক আম কোনো অবস্থাতে সংগ্রহ না করে এবং আমকে পোঁকা-মাড়কের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে চাষীদের কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, খুলনাঞ্চলে চলতি অর্থবছরে ৭৭৫৩ হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ করা হয়েছে। অঞ্চলে আমের সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। বিপরীতে বিক্রির টার্গেট রয়েছে ৫৬৩ কোটি টাকার উপরে। বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে শিলা বৃষ্টি না হলে এই অঞ্চলে উৎপাদিত আম দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানী করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধিকরণসহ রেমিট্যান্স অর্জণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



