জাতীয় সংবাদ

সাপ্লিমেন্ট সরবরাহের আইনি কাঠামো

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ গত ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খুলতে ব্যাংকগুলোকে নিষেধ করে দেয়। এর আগে ২১ এপ্রিল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরকে চিঠি দিয়ে ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টসহ কয়েক ধরনের সাপ্লিমেন্ট আমদানির জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি তুলে ধরে। চিঠিতে বলা হয়, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট, হারবাল সাপ্লিমেন্ট, নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্ট, মেডিকেল নিউট্রিশন থেরাপিউটিক নিউট্রিশন এবং সম্পূরক পথ্যজাতীয় পণের উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, বিক্রয় ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিবন্ধন অথবা পূর্বানুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, অনুমোদন ছাড়াই কিছু ব্যবসায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে এসব পণ্য আমদানি করছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজারে প্রচলিত ফুড সাপ্লিমেন্টের একটি বড় অংশই অবৈধ পথে দেশে আসছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে ‘লাগেজ পার্টি’র মাধ্যমে বা মিথ্যা ঘোষণায় এসব পণ্য আনা হয়। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সাম্প্রতিক অভিযানে ‘বার্ড ফুড’ বা পাখির খাবার ঘোষণা দিয়ে ক্ষতিকর ড্রাগ ও উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট আমদানির প্রমাণ পাওয়া যায়। আমদানি করা এসব পণ্যের গায়ে অনেক সময় বিএসটিআই বা ডিজিডিএ-র অনুমোদন থাকে না, ফলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না তারা আসল পণ্য কিনছেন নাকি ভেজাল কোনো রাসায়নিক মিশ্রিত পাউডার কিনছেন। বাংলাদেশে ফুড সাপ্লিমেন্ট নিয়ন্ত্রণে একাধিক সংস্থা কাজ করছে। ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর মাধ্যমে এই খাতকে আরও সুসংগঠিত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কাজ করছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। দেশে ফুড সাপ্লিমেন্ট আমদানি ও বাজারজাত করতে হলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে তদারকির সীমাবদ্ধতার কারণে এই পণ্যটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এছাড়া স্বাস্থ্য সাপ্লিমেন্ট সংক্রান্ত আলাদা বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে এই খাতের নিবন্ধন, উৎপাদন ও বিপণনে আরও স্বচ্ছতা আসে। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপসচিব (ঔষধ প্রশাসন ১ ও নীতি শাখ) মো. কায়সার রহমান বাংলানিউজকে বলেন, আমরা মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক বিষয়গুলো দেখভাল করি। এ ধরনের সাপ্লিমেন্ট আমদানির অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুড সাপ্লিমেন্ট কখনোই স্বাভাবিক খাদ্যের বিকল্প নয় এবং প্রয়োজন ছাড়া এসব গ্রহণ করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে অতিরিক্ত ডোজ, ওষুধের সঙ্গে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে রোগের প্রকৃত কারণ নির্ণয় না করে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম নয়। অনেক হারবাল সাপ্লিমেন্টে অজানা রাসায়নিক বা স্টেরয়েড জাতীয় উপাদান থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ন্যাচারাল বা হারবাল লেখা থাকলেই তা নিরাপদ এমন ধারণাও ভুল। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেস (বিআইএইচএস) জেনারেল হাসপাতালের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের প্রধান এবং সিনিয়র পুষ্টিবিদ শারমিন আক্তার বাংলানিউজকে বলেন, ফুড সাপ্লিমেন্ট কোনো পুষ্টিবিদ কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া একদমই গ্রহণ করা উচিৎ না। আমাদের ন্যাচারাল ফুড যেগুলো আছে, সেগুলোকে কি ফুড হিসেবে নেওয়া যায় না, কেনো সাপ্লিমেন্ট খেতে হবে? তিনি আরও বলেন, অনেক সময় দেখা যায় অসুস্থ লোক, যে প্রয়োজনীয় সাধারণ খাবার খেতে পারছে না, নিউট্রিয়েন্ট ডেফিসিয়েন্সি থেকে যাচ্ছে, তখন আমরা তাকে ফুড সাপ্লিমেন্ট দিয়ে থাকি। সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ, যে স্বাভাবিক খাবার খেতে পারে, তাকে কেনও বাড়তি ফুড সাপ্লিমেন্ট নিতে হবে। আমরা ন্যাচারাল সব কিছু ছেড়ে সিনথেটিক ফরমে চলে যাচ্ছি, এটা হওয়া উচিৎ না। এজন্যেই আমাদের রোগ-বালাইয়ের হার বেড়ে গেছে। বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ পুষ্টিবিদ বলেন, এগুলো হচ্ছে ব্যবসায়ীক চিন্তা ভাবনা, যার যার পকেট ভারি করার কৌশল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন ইউটিউব ডাক্তার, ফেসবুক ডাক্তার, ইউটিউব-ফেসবুক-অনলাইন ডায়েটিশানে ছেয়ে গেছে। একজন মানুষের বিভিন্ন পরীক্ষার নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখে, লাইফ স্টাইল দেখে, একজন ব্যক্তির ডায়েট নির্ধারণ করতে হয়, এটা আবার ব্যাক্তি থেকে ব্যাক্তিতে পরিবর্তিত হয়। এসব ছাড়া ফুড সাপ্লিমেন্ট খাওয়া একেবারেই ঠিক না। এভিক্স ফার্মাসিটিক্যাল লি. ইউকে- এর বিজনেস অ্যান্ড এইচআর উপদেষ্টা নৃপেন চৌধুরী বলেন, ফুড সাপ্লিমেন্ট মানে খারাপ কিছু নয়। তবে এর যত্রতত্র ব্যবহার সাপ্লিমেন্টের সত্যিকারে বৈজ্ঞানিক ধারনা নষ্ট করছে। ডাক্তারের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার অনেক ভালো ফলাফল বয়ে আনতে পারে। মানবদেহের অনেক ধরনের পুষ্ঠিজনিত সমস্যা দূর করা বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদারের ক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্টের বেশ কার্যকর ভূমিকাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button