স্থানীয় সংবাদ

ঐতিহাসিক ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ আজ

রক্তাক্ত ৫ আগস্ট

স্টাফ রিপোর্টার : রক্তাক্ত ৫ আগস্ট। ঐতিহাসিক ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’। আজ বুধবার দিবসটির দ্বিতীয় বর্ষপূর্ত্তি। ‘জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ বুধবার সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ পালিত হবে।
২০২৪ সালের আজকের এ দিন অর্থাৎ ৫ আগস্ট ছিল দীর্ঘ একমাসের আন্দোলনের শেষ দিন। অভ্যুত্থানের ক্যালেন্ডারে যার নাম দেয়া হয় ‘৩৬ জুলাই’। এ দিন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে হাজারো মানুষ ঢাকার কেন্দ্রস্থলের দিকে রওনা দেন। তীব্র আন্দোলন, লাশের মিছিল আর বাংলার মানুষের আত্মত্যাগের কাছে নত হয়ে দেশত্যাগ করে ভারতে পলায়ন করতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। অবসান হয় আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার।
ওইদিন দুপুরের দিকে শেখ হাসিনার পলায়নের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রাস্তায় নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ। বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠেন সকলে। ঢাকার রাজপথে তখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই, চারিদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। গণভবন, সংসদ ভবন আর ওই চত্বরে থাকা সরকারি বাংলোগুলোতে লাখো মানুষ ভিড় জমান। ক্ষমতার চেয়ার থেকে স্বৈরশাসককে উৎখাতের আনন্দে শেখ হাসিনার মসনদ সেই গণভবনে গিয়ে ক্ষমতার দম্ভকে চুরমার হতে নিজ চোখে দেখেন লাখো সাধারণ ছাত্র-জনতা।
সরকারি চাকরিতে কোটা বহাল রাখার প্রতিবাদে গত বছরের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। ক্রমেই সেই আন্দোলন দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। কোটা না মেধা স্লোগানে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সমর্থকরা আন্দোলনকারীদের রক্তাক্ত করে। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদসহ সারাদেশে বেশ কয়েকজন নিহত হলে আন্দোলন রূপ নেই বজ্রকণ্ঠে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের আক্রমণে বাড়তে থাকে লাশের মিছিল। আন্দোলনকারী ছাড়াও ছোট শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়। এক পর্যায়ে কোটা আন্দোলন শত শত হত্যার বিচার দাবিতে শেখ হাসিনার পতনের দিকে প্রতিধ্বনিত হয়। তার পদত্যাগের একদফা দাবিতে আন্দোলন পরিণত হয় জুলাইয়ের রক্তাক্ত বিস্ফোরণে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে বলা হয়, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ঘটনায় ১১৮ শিশুসহ এক হাজার ৪০০ জনকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। শিশু হত্যার হার ১২-১৩ শতাংশ। আহত হয়েছেন প্রায় ১২ হাজার। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই নৃশংস পথ বেছে নেন হাসিনা।
হাজারো শহিদের রক্ত মাড়িয়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা : জনরোষ আর তিরস্কার ও ঘৃণা সঙ্গী করে, হাজারো শহিদের রক্ত মাড়িয়ে ২ বছর আগে এদিনে (গণঅভ্যুত্থান ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই) দেশ থেকে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন গণভবন দখলে নেন ছাত্র-জনতা। একদিকে ছিল বিজয় মিছিল, অন্যদিকে নৃশংসতা। শেখ হাসিনার দেশছাড়ার পরও যাত্রাবাড়ী ও আশুলিয়াতে চলে গণহত্যা।
ভাইয়ের মরদেহের সুরতহাল বাদ দিয়ে বুলেটে বিদীর্ণ বুক নিয়ে, কদমে কদমে কাঁটাতার, তাজা রক্ত, দমবন্ধ টিয়ারগ্যাস মাড়িয়ে গণভবনের কয়েক গজে যখন মুক্তিকামীরা, সূর্য তখন মগজে।
একসময়ের দোর্দ- প্রতাপ আর ক্ষমতার ওপর জনরোষের তিরস্কার— পালালেন শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক ও দেশিয় গণমাধ্যমে সেটি বড় অক্ষরে হয় প্রধান খবর। বিদ্রোহ রূপ নেয় বিজয়ে। গণভবন, সংসদ ভবন, রাজপথে তখন লাখো মানুষের ঢল। টানা দেড় যুগে নির্যাতিতদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে মুহূর্তেই।
একদিকে বিজয় উল্লাস, ঠিক তার উল্টো পিঠে রাজধানীর দুই প্রবেশমুখ সাভার, আশুলিয়া ও যাত্রাবাড়ীতে চলে নৃশংসতা। সকাল থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত কয়েকজন নিহত হলেও বড় সহিংসতা ঘটে তারপর।
ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী থানার ভেতর থেকে গ্রেনেড সদৃশ কিছু নিক্ষেপ করা হয় ছাত্র-জনতার উপর, দিক-বিদিক ছোটাছুটির মধ্যে কিছু বুঝে উঠার আগেই প্রান হারান অর্ধশত মানুষ।
নিরস্ত্র অনেকেই আকুতি জানিয়েও শেষ রক্ষা পাননি। আধা ঘণ্টা পর গলি আর ফুটপাত পরিণত হয় তাজা মরদেহের স্তূপে। অন্যপ্রান্ত সাভার, আশুলিয়ায় রাত পর্যন্ত শুধু গুলিবর্ষণ আর হত্যা-ই হয়নি। ৬ জনের মরদেহ পুড়িয়ে দেয়ার মতো নৃশংসতার সাক্ষীও হয় দেশ।
এর আগে, কারফিউ ভাঙতে বিচ্ছিন্নভাবে হত্যাযজ্ঞ চলে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে। চানখারপুলের সকাল ছিল বেশি বিভৎস। নিকট দূরত্ব থেকে নগ্ন হামলা চলে সেখানে। এমন তাজা রক্ত, মগজ দিয়ে আজন্ম পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়ে ক্ষমতা মাড়িয়ে যে বিজয়, সেটিই তো জুলাই— ৩৬ জুলাই!
ছাত্র-জনতার বিজয়ের এই ঐতিহাসিক দিনটিকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে অন্তর্র্বতী সরকার। রাজনৈতিক দলগুলোও এ দিবসে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। দ্বিতীয়বারের মতো দিনটি উদযাপন করছে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে বুধবার সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে দেয়া দিনটির স্মরণে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে নানা আয়োজন।
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’র জাতীয় কর্মসূচি : ‘জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ বুধবার সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ পালিত হবে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বেলা ১২টায় জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সভায় সভাপতিত্ব করবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান এমপি।
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার সকাল ৬টা ১ মিনিটে শাহবাগস্থ জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি এবং জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিরাও বক্তব্য দেবেন।
দিবসটি উপলক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীসহ দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের সব জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনসমূহেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে।
এছাড়া দেশের সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, সামরিক জাদুঘর, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরসহ সরকারি ও বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্রসমূহ শিশুদের জন্য দিনব্যাপী উন্মুক্ত রাখা হবে। সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু পরিবার ও বৃদ্ধাশ্রমে বিশেষ প্রীতিভোজের আয়োজন করা হবে।
একইসাথে, রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সরকারি ভবন ও স্মৃতিস্তম্ভ জাতীয় পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভার পাশাপাশি রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button