ভাতার টাকার সবই যায় ওষুধ কিনতে, খাবারের খরচ মেটাতে হিমশিম প্রবীণদের

# বিশ্ব প্রবীণ দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রতিবেদন #
# দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত অধিকাংশ প্রবীণ, মাসে ওষুধেই ব্যয় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা
# খুলনায় ১ লাখ ১২ হাজার ২০০ প্রবীণ পাচ্ছেন ভাতা, বরাদ্দ ৮০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা
# ভাতা কিছুটা স্বস্তি দিলেও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বাড়তি আয়ের সন্ধানে প্রবীণরা
# চিকিৎসা ভাতা চালুর দাবি প্রবীণদের, বিশেষজ্ঞদের মতে জীবনধারণে ৭০০ টাকা যথেষ্ট নয়
কামাল মোস্তফা ঃ প্রায় দশ বছর ধরে শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে ভুগছেন খুলনা মহানগরীর ২৪ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ৬৭ বছর বয়সী আব্দুল জব্বার। ভারি কোন কাজ করতে পারেন না তিনি। মাঝে মধ্যে ছোট খাটো অল্প পরিশ্রমের কাজ পেলে যান। দুই বছর হলো বয়স্ক ভাতার অর্ভুক্ত হয়েছেন তিনি। আগে ৬৫০ টাকা হারে ভাতা পেলেও বর্তমান সরকারের সময়ে ৭০০ টাকা হারে ভাতা পাচ্ছেন। ভাতার টাকা হাতে পেলেই প্রথম খরচ করেন ওষুধ কিনতে। আয় থেকে ব্যয় বেশি হওয়ায় সংসারের খরচ মেটানোর হিসাব তার কাছে কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অসুস্থ শরীর নিয়ে যখন যে কাজ পান সেই কাজেই নামতে হয় তাকে। খুলনা মহানগরী ও জেলার অন্তত দশজন বয়স্ক ভাতাভোগির কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭শত টাকা হারে পাওয়া ভাতার বড় একটি অংশই তাদের ব্যয় হয় চিকিৎসায়। এ ছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় খাবারের পেছনে। দশ জনের মধ্যে ৭ জনকেই খাবারের ব্যয় মেটাতে কাজ করতে হয়। বাকি তিনজন অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারেন না। সন্তানদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এদের মধ্যে তিনজনের আয়-ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনজনের গড় আয় ১০ হাজার টাকার মধ্যে। অসুস্থতার কারণে এ আয় আবার কখনো কমেও যায়। স্বামী-স্ত্রী মিলে মাসে ২-৩ হাজার টাকাই ব্যয় হয় ওষুধের পেছনে। তিন মাস পর পর ভাতা বাবদ দুই হাজার সাতশো টাকা পান তারা। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় খুলনা মহানগরী ও জেলার নয় উপজেলায় চলতি অর্থবছরে মোট বয়স্ক ভাতাভোগির সংখ্যা ১ লক্ষ ১২ হাজার ২০০ জন। মোট বরাদ্দকৃত টাকার পরিমাণ ৮০ কোটি ৭৮লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোঃহোসেনুর রহমান বলেন, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির গুরুত্বপূর একটি অংশ প্রবীনণদের বয়স্ক ভাতা । নানান সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও বর্মাণ সরকার ভাতার পরিমাণ ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭শ টাকা করেছে। সচ্ছতার সাথে তালিকা প্রস্তুত করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সুবিধাভোগিদের কাছে তিনমাস পরপর টাকা পৌছে যায়। ভাতার মাধ্যমে কিছুটা হলেও প্রবীণদের পাশে থাকার চেষ্টা করে সরকার। মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বাত-ব্যথা, হৃদ্রোগ, শ্বাসকষ্ট ও চোখের সমস্যা। বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেকের একাধিক দীর্ঘমেয়াদি রোগ একসঙ্গে দেখা দেয়। বাংলাদেশের প্রবীণদের নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগকে উল্লেখযোগ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রবীণদের দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় মাসে গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা ব্যয় হতে পারে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. সেলিনা আহমেদ বলেন, একজন মানুষের জীবনধারণের জন্য এই অর্থ যথেষ্ট নয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ভেতরে এটাকে মন্দের ভালো বলা যায়। একেবারে না পাওয়ার থেকে কিছুটা পাচ্ছে এটা ইতিবাচক দিক। জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, “ভাতার টাকা পেলে কিছুটা স্বস্তি পাই। কিন্তু চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় মেটাতে এ অর্থ খুবই সামান্য। আমাদের দাবি আগামীতে প্রবীণদের জন্য ভাতার পরিমাণ বাড়ানো। সরকার বিভিন্ন কার্ড চালু করছে। প্রবীণদের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা ভাতা চালু করা গেলে আমরা অনেক উপকৃত হব।



