জাতীয় সংবাদ

গেরুয়া বুলডোজারে ত্রাসের রাজত্ব পশ্চিমবঙ্গে, নিহত ৪

# বিজেপির জয়ের প্রভাব #
পরিস্থিতি এখন অগ্নিগর্ভ
কলকাতা নিউমার্কেটে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দোকানপাট
নিউমার্কেটের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী মুসলিম
উচ্চ শব্দে ডিজে চালিয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে হামলা

প্রবাহ ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই রাজ্যের আকাশ-বাতাসে এখন বারুদের গন্ধ আর বিপন্ন মানুষের আর্তনাদ শুরু হয়েছে। গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই রাজধানী কলকাতাসহ গোটা রাজ্য রক্তক্ষয়ী ও উন্মত্ত সহিংসতার কবলে পড়েছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রের সব শালীনতা চূর্ণবিচূর্ণ করে বিজয়ী গেরুয়া শিবিরের ‘বুলডোজার’ রাজনীতি আর পৈশাচিক আস্ফালন বাংলাকে অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কলকাতার রাজপথ ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান আর গেরুয়া পতাকায় ছেয়ে গেছে।
এমনকি যেসব এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেস জয়ী হয়েছে, সেখানেও প্রাণ বাঁচাতে এবং ঘরবাড়ি রক্ষা করতে সাধারণ মানুষ ও কর্মী-সমর্থকরা নিজেদের ছাদে বিজেপির পতাকা টাঙাতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি কোনো রাজনৈতিক সমর্থন নয়, বরং পৈশাচিক শক্তির হাত থেকে বাঁচার চরম আকুতি। কলকাতার অন্যতম বড় মুসলিম সমাধিস্থল গোবরা কবরস্থান অঞ্চলে বিজেপি ও ‘জয় শ্রী রাম’-এর পতাকা টাঙানো হয়েছে।
কলকাতার মেটিয়াবুরুজ, মহেশতলা, তিলজলা ও তপসিয়ার মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি এখন অগ্নিগর্ভ। তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ ‘মুসলিম বেল্টগুলোতে’ বিজেপি বুলডোজার নামিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
এ ভয়াবহ রাজনৈতিক পালাবদলের মুখে এন্টালি ও তপসিয়ার সংযোগস্থলে তৃণমূলের দাপুটে নেতা তাবরেজ খান তার অনুসারীদের নিয়ে প্রাণভয়ে রাতারাতি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। এন্টালিতে তৃণমূল জিতলেও তাবরেজের এ দলবদল এবং বিজেপি নেত্রী প্রিয়াঙ্কা টিপ্রেওয়ালকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেওয়ার দৃশ্যটি বুঝিয়ে দেয়, বাংলার মানুষ আজ কতটা অসহায়। ভুক্তভোগীদের একটাই কথা, ‘পতাকা না টাঙালে যদি বুলডোজার চলে আসে? জান বাঁচানোই এখন বড় লড়াই।’
গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘর্ষে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছে বহু মানুষ। কলকাতার বেলেঘাটায় তৃণমূলের পোলিং এজেন্ট বিশ্বজিৎ পট্টনায়েককে (৪৫) ঘর থেকে টেনে বের করে নৃশংসভাবে পিটিয়ে মারার অভিযোগ উঠেছে।
নিহতের পরিবারের দাবি, দরজা ভেঙে ঢুকে তাকে নিষ্ঠুরভাবে মারা হয়েছে, অথচ প্রতিবেশীরা ভয়ে এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। পুলিশ এ ঘটনাকে ‘ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরিবারের অভিযোগ, এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকা-।
রাজধানী কলকাতার বাইরেও হিংসার আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। উদয়নারায়ণপুরে যাদব বর নামে এক বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে নানুরে আবির শেখ নামে এক তৃণমূল কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আসানসোল, বর্ধমান, হুগলি থেকে শুরু করে জলপাইগুড়ি—সব জায়গাতেই তৃণমূলের পার্টি অফিস দখল এবং কর্মীদের মারধরের খবর আসছে।
কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেও পোস্টার ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এন্টালি ও সংলগ্ন এলাকায় বহু তৃণমূল কর্মীর বাড়িঘর ও কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য এ সংঘর্ষকে তৃণমূলের প্ররোচনা বলে দাবি করে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ফল উল্টো হলে বিজেপির ২০০ কর্মী খুন হতো।
তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে অন্যকথা। কলকাতার প্রতিটি মোড়ে এখন গেরুয়া প্লাবন, যেখানে তৃণমূলের সবুজ রঙ কার্যত মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় বাড়ির নীল-সাদা রঙ পাল্টে গেরুয়া করতে বাধ্য হবে শিগগির।
নব্য শাসক দলের এ আস্ফালন আর ‘অনুপ্রবেশকারী’ হটানোর নামে নির্দিষ্ট জনপদকে টার্গেট করার এ ঘৃণ্য রাজনীতি বাংলার সামাজিক বুননকে চিরতরে তছনছ করে দেওয়ার পথে। ২০২৬-এর এ পরিবর্তন আসলে এক মৃত্যুপুরীর উদ্বোধন, যেখানে বুলডোজারের গর্জনই এখন শেষ কথা।
বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আপনারা বাড়ির সামনে ধ্বজা উত্তোলন করে রাখুন, যাতে হিন্দু ও মুসলিম বাড়ি চিহ্নিত করা যায়!’ এভাবে মুসলমানদের নিশানা করে পশ্চিমবঙ্গে আগামী দিনে কী ঘটতে চলেছে, তা শিউরে ওঠার মতো। এ শুভেন্দুই নাকি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে প্রথমে রয়েছেন।
কলকাতা নিউমার্কেটে বুলডোজার তান্ডব : বিজেপি নির্বাচনে জয়ের পরদিনই উত্তর ভারতের ধাঁচে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার হগ মার্কেট বা নিউমার্কেটে দোকানঘরে বুলডোজার মিছিল নিয়ে তান্ডব চালানো শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেখানে বুলডোজার চালিয়ে একাধিক দোকানঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গত সোমবার প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তারপর এ ঘটনা উদ্বিগ্ন করেছে প্রশাসনকে। বুলডোজার নিয়ন্ত্রণে কড়া পদক্ষেপের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। নিউমার্কেটের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন সমাজকর্মী সৌম্য ম-ল বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা-সাতটা নাগাদ বুলডোজার দিয়ে দোকানপাট ভাঙা শুরু হয়েছে।
সৌম্য ম-ল বলেন, ‘একটা বড় অংশজুড়ে ঘটনাটা ঘটেছে। আমি ও আমার সঙ্গে থাকা এক বন্ধু ঘটনার অল্পই দেখতে পেয়েছি এবং ভিডিও করতে পেরেছি। কলকাতা পৌরসভার উল্টো দিকে একটি কাপড়ের দোকানে বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুহূর্তেই সেটি মাটিতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
সৌম্য ও তাঁর এক বন্ধু ইউপি-বিহার নামের একটি রেস্তোরাঁ থেকে খেয়ে বের হচ্ছিলেন। সেই রেস্তোরাঁর পাশে ওই কাপড়ের দোকানের অবস্থান। ইউপি-বিহার নিউমার্কেটের একটি বড় খাবারের দোকান, যেখানে গরুর মাংসও পাওয়া যায়। সৌম্য ম-ল বলেন, বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুর শুরু হলেই দোকানের কর্মীরা আলো নিভিয়ে দেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সৌম্য আরও বলেন, ‘এরপর আমরা রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে বুলডোজার দেখতে পাই, যেটি দিয়ে দোকান ভেঙে দেওয়া হচ্ছিল। উচ্চ শব্দে ডিজে চালিয়ে বিজেপির স্লোগান “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি দেওয়া হচ্ছিল। “জয় শ্রীরাম” স্লোগানও দেওয়া হচ্ছিল। পুরো অঞ্চল ছিল বিজেপির পতাকায় মোড়া।’
সৌম্য অভিযোগ করেন, ‘নিউমার্কেট এলাকায় যখন দোকান ভেঙে দেওয়া হচ্ছিল, তখন সেখানে উর্দি পরে কলকাতা পুলিশের অসংখ্য সদস্য মোতায়েন ছিলেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীর লোকজন ছিলেন, তবে তাঁদের ভিডিও আমরা করতে পারিনি। তবে এ ঘটনা পুলিশের সামনেই ঘটেছে।’
ওই অঞ্চলের একাধিক দোকানঘর ভেঙেছে বলে সৌম্য জানান। তিনি বলেন, বাকি কোথায় কী ভেঙেছে, তা তিনি আর দেখেননি। দ্রুত ওই অঞ্চল থেকে সরে আসেন। কারণ, তাঁকে ছবি তুলতে বাধা দেওয়া হচ্ছিল।
তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে জানানো হয়েছে, ওই অঞ্চলে তাদের একটি দলীয় কার্যালয় এবং সংলগ্ন মানুষের দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কী ভেঙে দেওয়া হয়েছে বা কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের প্রচারমাধ্যমে বিস্তারিত কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
তবে কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ জানিয়েছেন, বুলডোজার নিয়ে মিছিল করা যাবে না। যেসব মালিক এ ধরনের কাজে বুলডোজার ভাড়া দেবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button