জাতীয় সংবাদ

ছাত্রদলের কমিটি গঠনের পর বিদ্রোহ-বিক্ষোভ, ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে বিএনপির

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মাত্র তিন মাস আগে সরকার গঠনের পর নানা ইতিবাচক পদক্ষেপে প্রশংসা কুড়াচ্ছে বিএনপি। বিশেষ করে কৃষিবান্ধব ও দারিদ্র্যনির্মূলে তাদের গৃহীত কর্মসূচি সব পর্যায় থেকে নন্দিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দলটির সহযোগী ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন নিয়ে বিদ্রোহ-বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে দেশজুড়ে। এর জেরে কোথাও কোথাও সহিংসতাও হয়েছে। এতে ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় রাজপথের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন এবং ’২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি যখন ইতিবাচক কার্যক্রমে জনআস্থা অর্জন করে চলেছে, তখন ছাত্রদলের কমিটি গঠন নিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতি দলটির হাইকমান্ডকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। যদিও শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না। তবে তারা কমিটি গঠনের পর উত্থাপিত অভিযোগগুলো আমলে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আরও যাচাই-বাছাইয়ের ওপর তাগিদ দিয়েছেন। সংগঠনে গতিশীলতা আনতে সম্প্রতি একযোগে দেশের ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে নতুন ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ। কিন্তু কমিটিগুলো প্রকাশের পরপরই তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত তীব্র ক্ষোভ ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, জুলাই বিপ্লব ও বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থাকা ত্যাগী, হামলা-মামলার শিকার কর্মীদের বাদ দিয়ে অছাত্র, বিবাহিত, ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদীদের কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) শাখা ছাত্রদলের কমিটি। সদ্য ঘোষিত ৩২ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ২০২৩ সালের কমিটির পদধারী অন্তত ৮ থেকে ১১ জন নেতা জায়গা পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সাবেক ছাত্রদল নেতা ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও বিব্রত করেছে। কমিটি ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন জেলায় শুরু হয় সংঘাত ও বিদ্রোহ। টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রির অভিযোগ এনে পদবঞ্চিতদের একটি বড় অংশ ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। এছাড়া নোয়াখালীতে সদ্য ঘোষিত কমিটিতে বিবাহিত ও অছাত্রদের প্রাধান্য দেওয়ার প্রতিবাদে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধরা। তারা কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরকে জেলায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। রাঙামাটিতে জেলা ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনী লাঠিচার্জ করে এবং প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করতে বাধ্য হয়। বরিশাল, বান্দরবান ও কক্সবাজারেও সড়ক অবরোধ, ঝাড়– মিছিল এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের কুশপুতুল পোড়ানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদলের কেন্দ্র ও তৃণমূলের একাধিক নেতা বাংলানিউজকে বলেন, যাদের রাজপথে কখনো দেখা যায়নি, কমিটিতে তাদের স্থান দেওয়া হয়েছে। আবার নিষিদ্ধ ও বৈরী ছাত্র সংগঠনের অনেককেও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের মাধ্যমে সংগঠনের শৃঙ্খলা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজপথে ভূমিকা রাখা, জেল-জুলুমের শিকার অনেক নেতা পদবঞ্চিত হয়েছেন। কীসের ভিত্তিতে কমিটিতে এমন পদায়ন হয়েছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। সেইসঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক, বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ছাত্রদলের কমিটি গঠনের পর যে বিদ্রোহ-বিক্ষোভ এবং সহিংসতা হয়েছে, এটা বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’র বার্তার বিপরীত কর্মকা-। পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়া কমিটি গঠনের ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের পদায়নের অভিযোগ সামনে আসায় এখন বৈরী সংগঠনগুলোর হাতে সমালোচনার হাতিয়ার উঠে গেছে। তারা এখন ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসনের জন্য ছাত্রদলকে অভিযুক্ত করছে, যা পরোক্ষভাবে বিএনপির ইমেজকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সার্বিক বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির গণমাধ্যমকে জানান, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার ভিত্তিতেই স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে কমিটি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রত্যাশীর তুলনায় পদ কম থাকায় অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দেন নাছির। ময়মনসিংহ মেডিকেলের কমিটিতে ছাত্রলীগ নেতাদের অনুপ্রবেশের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, ছাত্রলীগ গণহারে অনেককে পদ দিয়ে দিয়েছিল, ফলে অনেকে না জেনেও ছাত্রলীগের কমিটিতে ছিলেন, যাদের নাম এখন উঠে আসছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি, ধাপে ধাপে যাচাই-বাছাই করেই তারেক রহমানের অনুমতিক্রমে কমিটিগুলো দেওয়া হচ্ছে। কোনো কমিটিতে সরাসরি ছাত্রলীগের পদে থাকা কাউকে স্থান দেওয়া হয়নি। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের ১নং সহ-সভাপতি জহির রায়হান আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, বিষয়টি আমরা আগেও বারবার স্পষ্ট করেছি। বিগত ১৭ বছর ক্যাম্পাসগুলো ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা এমন একটা পরিবেশ তৈরি করেছিল যে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোর করে প্রোগ্রামে যেতে বাধ্য করা হতো। তবে আমাদের কমিটিতে এমন কেউ আসেনি যারা সরাসরি ছাত্রলীগের পদে ছিল। হয়তো বাধ্য হয়ে যাওয়া দুই-একজনের পুরোনো দু’একটি ছবি থাকতে পারে, আমরা সেগুলোও এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছি। কমিটিতে যারা এসেছে তারা ৫ আগস্টের আগে থেকেই ছাত্রদলের হয়ে কাজ করেছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলের সাবেক সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসিরুদ্দিন শাওনের প্রসঙ্গ টানেন তিনি। জহির রায়হান বলেন, ‘শাওনের ফার্স্ট ইয়ারে থাকাকালীন একটি ছবি ভাইরাল করা হয়েছে। অথচ গত ১২-১৩ বছর ধরে সে ছাত্রদলের রাজনীতি ধারণ করছে এবং দুইবার জেলও খেটেছে। একটি নির্দিষ্ট সংগঠন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ৫ আগস্টের পর থেকে এসব পুরোনো ছবি সামনে আনছে।’ এসময় উল্টো অভিযোগ করে ছাত্রদলের এই শীর্ষ নেতা দাবি করেন, ‘বরং এস এম ফরহাদ, সাদিক কায়েম– এরাই সরাসরি ছাত্রলীগের পোস্টেড নেতা ছিল।’ জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শামসুজ্জামান দুদু বাংলানিউজকে বলেন, ‘ছাত্রদল দেশের সবচেয়ে বৃহৎ ছাত্র সংগঠনের একটি। অতীতে অনেক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই সংগঠনের পুরোধা ভূমিকা ছিল। সম্প্রতি তাদের কিছু কিছু কর্মকা- নিয়ে সমালোচনার যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, সেই বিষয়গুলো সাংগঠনিক পর্যায়ে আলোচনা করা উচিত এবং সেটির যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকে নজর দেওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, ‘সংগঠন করতে গেলে অনেক সময় সরকারে থাকলে কিছু কিছু বহিরাগত সমাবেশ ঘটে। যারা সুবিধা বা এই মানসিকতা নিয়ে সংগঠনের ছত্রছায়ায় ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে, অপকর্ম করার চেষ্টা করে, তাদের ব্যাপারেও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ বা সংগঠকদের সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। তাহলে আমার মনে হয় অনেক সমালোচনার হাত থেকে বা সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাও এসব সুবিধাবাদীদের হাত থেকে রক্ষা পাবে।’ কিছু ইতিবাচক কার্যক্রমে সরকার প্রশংসিত হলেও ছাত্রদলের কমিটি গঠনকেন্দ্রিক এই বিদ্রোহ-বিক্ষোভ ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা এক্ষেত্রে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে ছাত্রদলকে আরও বিবেচনা করে এগিয়ে চলার পরামর্শ দেন। এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর গোলাম হাফিজ বাংলানিউজকে বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের তিন মাসের মধ্যে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা প্রশংসিত হয়েছে। তবে দলটির সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকা- তাদের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। এখনই যদি তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয় তাহলে ছাত্রদলের কারণে সরকারকে খেসারত দিতে হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button