জাতীয় সংবাদ

ভারত থেকে আসছে ভয়ঙ্কর অস্ত্র ‘পেন গান’

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ দেখতে একেবারে সাধারণ কলমের মতো। সহজেই পকেটে রাখা যায়, কারও সন্দেহ করারও সুযোগ থাকে না। কিন্তু ট্রিগার বাটনে চাপ দিলেই বেরিয়ে আসে প্রাণঘাতী বুলেট। মুহূর্তেই সব হয়ে যায় শেষ। ছদ্মবেশী এই অস্ত্রটি পরিচিত ‘পেন গান’ নামে। রাজধানীতে একটি হত্যাচেষ্টার ঘটনায় এই ‘পেন গান’র ব্যবহার উদ্বেগ তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মধ্যে। সম্প্রতি পুরান ঢাকার নয়াবাজারে রাসেল (৩১) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে আলোচনায় আসে এই অস্ত্র। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বলছে, উদ্ধার হওয়া পেন গানটি ভারতীয় তৈরি। অর্থাৎ ভারত থেকেই এসেছে ভয়ঙ্কর এই অস্ত্র। তবে অস্ত্রটি কী পরিমাণে অপরাধজগতে ছড়িয়েছে বা কী হারে এসেছে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য মেলেনি। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি চালালে মানুষ বুঝতে পারে এবং সেই অস্ত্র বহন বা তাক করার মুহূর্তগুলো সামান্য হলেও আঁচ করা যায়, যাতে আত্মরক্ষার যৎসামান্য হলেও সুযোগ মেলে। কিন্তু ‘পেন গান’ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি দেখতে কলমের মতো হওয়ায় টার্গেট করা ব্যক্তি বুঝে ওঠার আগেই গুলিবিদ্ধ হতে পারেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “একদম হুবহু কলমের মতো দেখতে এই আগ্নেয়াস্ত্র অত্যন্ত বিপজ্জনক। সাধারণ কোনো আগ্নেয়াস্ত্র বা পিস্তল দিয়ে গুলি চালালে মানুষ বুঝতে পারে এবং আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। কিন্তু কলমের মতো দেখতে এই অস্ত্র কেউ সহজে বুঝতেই পারবে না যে, এটি প্রাণঘাতী অস্ত্র। এই অস্ত্র দিয়ে মুহূর্তেই কারও জীবন চলে যেতে পারে, অথচ বোঝার কোনো উপায় থাকবে না।” “কলমের মতো দেখতে উদ্ধার হওয়া এই পেন গানের গায়ে কোনো দেশের নাম বা নির্মাতার পরিচয় ছিল না। পরবর্তীতে ব্যাপক তদন্তের পর প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, অস্ত্রটি ভারতের তৈরি”Ñমো. শফিকুল ইসলাম, ডিএমপির ডিবিপ্রধান অপরাধীরা যে কোনো জায়গায় এই অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে পারে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “এমনকি কলমের মতো দেখতে এই অস্ত্র বের করে অপরাধী সহজেই কাউকে বলতে পারেÑ‘একটু কাগজ দেন তো, লিখি’। আর সেই মুহূর্তেই টার্গেট অনুযায়ী গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে পারে অপরাধী।” তবে অস্ত্রটি নিয়ে উদ্বেগ ছড়ালেও গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, এখন পর্যন্ত এ ধরনের অস্ত্র খুব বেশি ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যেভাবে আলোচনায় আসে ‘পেন গান’ ঃ গত ৪ এপ্রিল রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর কোতোয়ালি থানার নয়াবাজার পার্ক এলাকায় রাসেল নামে এক যুবককে গুলি করা হয়। তিনি নিজেকে যুবদলের সদস্য বলে পরিচয় দিয়েছেন। গুলি তার বুকের বাম পাশে লাগে। গুলি করে হামলাকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে রাসেল চিকিৎসা শেষ করে তার বাসায় অবস্থান করছেন বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। আহত রাসেলের বাবার নাম মোহাম্মদ আলী। বর্তমানে তিনি শ্যামপুরের আসিং গেট এলাকায় বসবাস করেন। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা হয়। তদন্তে নেমে ডিবি পুলিশ সায়মন ও সোহেল ওরফে কাল্লুসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেরানীগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয় ছদ্মবেশী পেন গানটি। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা জানিয়েছেন, অস্ত্রটি প্রায় ৮০ হাজার টাকায় সংগ্রহ করা হয়েছিল। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “বিদেশি পিস্তল বা রিভলভার উদ্ধার হলে সেগুলোর গায়ে সাধারণত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কিংবা কোন দেশে তৈরিÑএ ধরনের তথ্য লেখা থাকে। কিন্তু কলমের মতো দেখতে উদ্ধার হওয়া এই পেন গানের গায়ে কোনো দেশের নাম বা নির্মাতার পরিচয় ছিল না। পরবর্তীতে ব্যাপক তদন্তের পর প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, অস্ত্রটি ভারতের তৈরি।” তিনি জানান, অস্ত্রটির কার্যক্ষমতা, ক্ষতিকর দিক ও গুলির রেঞ্জ নির্ধারণে ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ এ পরীক্ষা করছে। ডিবিপ্রধান বলেন, “এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা সবাই কারাগারে রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনে তাদের পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। উদ্ধার হওয়া পেন গানটি কীভাবে দেশের অপরাধীদের হাতে পৌঁছেছে, সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।” “পেন গানের মতো ছদ্মবেশী অস্ত্র টার্গেট কিলিং বা ব্যক্তিগত শত্রুতাজনিত হত্যাকা-ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভয়ংকর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সহজে বহনযোগ্য এবং সন্দেহের বাইরে থেকে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় এটি অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে”Ñড. তৌহিদুল হক, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নতুন নয়, আগেও ছিল ‘পেন গান’ ঃ অপরাধ জগতের পুরোনো সূত্র বলছে, ঢাকায় পেন গানের উপস্থিতি একেবারে নতুন নয়। ৯০-এর দশকের পর ফার্মগেট-রাজাবাজার এলাকায় মহসীন বাবু নামে এক যুবককে একাধিক পেন গানসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে সময় ঘটনাটি তুমুল আলোচিত হয় এবং বিভিন্ন পত্রিকা ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়েছিল। মহসীন বাবু দীর্ঘ কারাভোগের পরে জামিনে মুক্তি পান। তবে পরে তিনি হত্যাকা-ের শিকার হন। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, পেন গান ব্যবহার করে গুলির ঘটনা এবারই প্রথম বড় আকারে সামনে এলো। আতঙ্ক ও সতর্কতার বার্তা ঃ অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছদ্মবেশী এই অস্ত্র টার্গেট কিলিং বা ব্যক্তিগত শত্রুতাজনিত অপরাধে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলানিউজকে বলেন, “পেন গানের মতো ছদ্মবেশী অস্ত্র টার্গেট কিলিং বা ব্যক্তিগত শত্রুতাজনিত হত্যাকা-ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভয়ংকর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সহজে বহনযোগ্য এবং সন্দেহের বাইরে থেকে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় এটি অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক শত্রুতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকা- বা গুরুতর জখমের ঘটনা ঘটানো সম্ভব বলেও আশঙ্কা রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “এ অবস্থায় দেশে পেন গান কতটা ছড়িয়ে পড়েছে এবং কারা এটি আনছে, তা উদঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে কারা এসব অস্ত্র আনছে, কার কাছে আছে এবং কারা ব্যবহার করছেÑতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। এতে করে সম্ভাব্য সহিংসতা ও জনমনে সৃষ্ট আতঙ্ক অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।” এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, “আলোচিত এ ঘটনাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ঘটনার পরপরই থানা পুলিশ জানতে পারে কয়েকজন দুর্বৃত্ত রাসেলকে লক্ষ্য করে এগিয়ে আসে। এ সময় তাদের মধ্যে একজনের হাতে থাকা ছোট আকারের কিছুটা লম্বা আকৃতির একটি বস্তু থেকে তাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় কোনো কিছু। মুহূর্তেই রাসেল বুকে তীব্র আঘাত অনুভব করেন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে ঘটনার তদন্তে নেমে গোয়েন্দা পুলিশ কলমের মতো দেখতে আলোচিত সেই পেন গান উদ্ধার করে।” বর্তমানে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিরা কারাগারে রয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, পেন গানের উৎস, সরবরাহ চক্র ও এর বিস্তার নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান চলছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button