জাতীয় সংবাদ

হেলিকপ্টার কোম্পানির মালিক হতে সাবেক বিমান উপদেষ্টার কা-!

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ নিয়ম ভেঙে বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার পরিবহন প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশীরউদ্দীনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বেক্সিমকো এভিয়েশনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ‘আকিজ বশির এভিয়েশন’ নামে পরিচালনা করছেন। এছাড়া আনুষ্ঠানিক বরাদ্দের আগেই প্রতিষ্ঠানটির হ্যাঙ্গার দখলেরও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। একই প্রতিষ্ঠানের এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি) যিনি জমা দিয়েছেন, মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তিনিই আবার নতুন প্রতিষ্ঠানের নামে সেই সার্টিফিকেট নেওয়ার আবেদন করেছেন। বেক্সিমকো এভিয়েশন থেকে আকিজ বশির এভিয়েশনে রূপান্তরের ঘটনায় এমন বিতর্কিত কর্মকা-ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন বেক্সিমকো এভিয়েশনের সাবেক এবং আকিজ বশির এভিয়েশনের বর্তমান সিইও ক্যাপ্টেন গুলজার হোসাইন। অভিযোগ অনুযায়ী, এক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থেকেও অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একই ধরনের অনুমোদনের আবেদন করেছেন তিনি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব পড়ে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর। সেই ধারাবাহিকতায় চাপে পড়ে দেশের অন্যতম হেলিকপ্টার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো এভিয়েশনও। দেশের অন্যতম হেলিকপ্টার সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করতে সিভিল এভিয়েশনকে একটি চিঠি দেন সিইও গুলজার হোসাইন। তবে তার দাবি, মালিকপক্ষের সিদ্ধান্তেই ওই চিঠি দেন তিনি। এ ব্যাপারে বেক্সিমকো এভিয়েশনের তৎকালীন চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও) ক্যাপ্টেন গুলজার হোসাইন বলেন, ‘বেক্সিমকোর ব্যাপারে এত পরে আমাকে এসব জিজ্ঞেস করাটা একটা বিব্রতকর ব্যাপার। অবশ্যই এটা মালিকপক্ষের সিদ্ধান্ত ছিল, একজন কর্মকর্তা হিসেবে আমি এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইখতিয়ার রাখি না।’ তবে ভিন্ন তথ্য দিলেন বেক্সিমকো এভিয়েশনের দুই পাইলট। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেক্সিমকো এভিয়েশনের তৎকালীন ডিএফও ক্যাপ্টেন জাহিদুর রহমান বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির দিকে হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত হয় যে এই কোম্পানির এওসিটাকে ডিসকন্টিনিউ করা হবে এবং সিইওর পক্ষ থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আকিজ বশিরের একটা কোম্পানি তৈরি করার ব্যাপারে তাদের কিছু এক্টিভিটিস ছিল।’ বেক্সিমকো এভিয়েশনের তৎকালীন সিওও ক্যাপ্টেন মাহবুব আলম বলেন, ‘আমাদেরকে একটা প্রেসার দেওয়া হচ্ছিল আমরা যেন ওখান থেকে রিজাইন দেই।’ তিনি বলেন, ‘বেক্সিমকো এভিয়েশনটা ক্লোজ করে ফেলা হলে আকিজ বশির খুব দ্রুতই এই ইউওসিটা পাবে। উনি যেহেতু উপদেষ্টা ছিলেন, তার জন্য খুব সহজ হবে ইউওসিটা পাওয়ার জন্য।’ জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর নিয়মবহির্ভূতভাবে ডিরেক্টর ফ্লাইট অপারেশনসকে না জানিয়েই একটি ভিআইপি ফ্লাইট করেন সিইও ক্যাপ্টেন গুলজার হোসাইন। সেই ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন তৎকালীন বাণিজ্য ও পরে বিমান উপদেষ্টা হওয়া শেখ বশীরউদ্দীন। এ ব্যাপারে বেক্সিমকো এভিয়েশনের তৎকালীন ডিএফও ক্যাপ্টেন জাহিদুর রহমান বলেন, ‘উনি ফ্লাই করেছিলেন রাজশাহীতে, কিন্তু এ ব্যাপারে আমাকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি।’ এই ফ্লাইটের পরই ঘুরে যায় ঘটনার মোড়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বেক্সিমকো এভিয়েশন। ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ছিল প্রতিষ্ঠানটির শেষ কর্মদিবস। ৪ মার্চ সিইও নিজেই বেক্সিমকো এভিয়েশনের এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট ও হ্যাঙ্গার সারেন্ডারের আবেদন করেন। তার দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনিই আবার আকিজ বশির এভিয়েশনের পক্ষে এনওসির জন্য আবেদন করেন। ২ জুন ২০২৫ পর্যন্ত বেক্সিমকো এভিয়েশনের হ্যাঙ্গার বরাদ্দ থাকলেও মার্চেই সেই হ্যাঙ্গার হয়ে যায় আকিজ বশির এভিয়েশনের অলিখিত অফিস। যদিও তাদের নামে হ্যাঙ্গার বরাদ্দ হয় আরও তিন মাস পর। বেক্সিমকো এভিয়েশনের তৎকালীন সিওও বলেন, ‘আমাদের শেষ অফিস করার ঠিক ১ থেকে ২ দিন পরেই দেখলাম আকিজ বশির ঠিক একই জায়গায়, আমাদের অফিসটাতেই অফিস করছে।’ বরাদ্দের তিন মাস আগেই আকিজ বশির বেক্সিমকো এভিয়েশনের হ্যাঙ্গারে উঠে যাওয়ার বিষয়টি জানে না সিভিল এভিয়েশনও। একই সিইও দুটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করায় সুকৌশলে তারা বিষয়টি গোপন করেছেন। তবে এটি অস্বীকার করেন আকিজ বশির গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শেখ বশীরউদ্দীন। তিনি বলেন, ‘যে হ্যাঙ্গারে এখন আমাদের অ্যালোকেট করা হয়েছে এটা একসময় বেক্সিমকো এভিয়েশনের নামে ছিল। এটার কী ক্যাচাল হয়েছে না হয়েছে এটা আমার চিন্তারও বিষয় না, জানারও বিষয় না। আর বেক্সিমকোর হেলিকপ্টার আমার হ্যাঙ্গারের মধ্যে নাই।’ শেখ বশিরউদ্দীনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হেলিকপ্টার জোনে গিয়ে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একাধিক হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার দেখা যায়। পরিদর্শনে দেখা যায়, যে হ্যাঙ্গারটি আগে বেক্সিমকো এভিয়েশনের নামে পরিচিত ছিল, সেখান থেকে প্রতিষ্ঠানের নেমপ্লেট সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে ওই হ্যাঙ্গারে রাখা আছে তিনটি হেলিকপ্টার। হ্যাঙ্গারে থাকা তিনটি হেলিকপ্টারের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে একটি, যা সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা শেখ বশীরউদ্দীনের মালিকানাধীন বলে জানা গেছে। এর পাশেই রাখা আছে রবিনসন আর-৬৬ (এস২-এফআর) এবং বেল-৪৩০ (এস২-এসএফআর) মডেলের আরও দুটি হেলিকপ্টার। রেজিস্ট্রেশন নম্বর যাচাই করে দেখা যায়, এই দুটি হেলিকপ্টার বেক্সিমকো এভিয়েশনের। বেক্সিমকো এভিয়েশনের হ্যাঙ্গারের খোঁজে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রতিষ্ঠানটির দুটি হেলিকপ্টারের পাশাপাশি আরও একটি হেলিকপ্টার রাখা হয়েছে। তবে বর্তমানে হ্যাঙ্গারটি আর বেক্সিমকো এভিয়েশনের পরিচয়ে পরিচালিত হচ্ছে না; সেটি এখন আকিজ বশির এভিয়েশনের হ্যাঙ্গার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়াও বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা থাকা অবস্থাতেই বিমানের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন শেখ বশীরউদ্দীন। এতে তখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এছাড়া অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান সিভিল এভিয়েশন অথরিটি থেকে হেলিকপ্টার ব্যবসার লাইসেন্স পেতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button