ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক ঈদুল আজহা

বৃহস্পতিবার ঈদ
স্টাফ রিপোর্টার : আগামী বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্য্যরে সঙ্গে আগামী বৃহস্পতিবার (২৮ মে) পালিত হবে ঈদুল আজহা।
ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত পরম আনন্দের একটি দিন। এটি কেবল একটি উৎসব নয়; এটি মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহৎ মাধ্যম। কুরবানি মানে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর প্রতি উৎসর্গ করে ত্যাগ ও তিতিক্ষার দৃষ্টান্ত পেশ করা। ঈদুল আজহার দিন থেকে শুরু করে দ্বাদশতম দিন পর্যন্ত, যেসব মুসলমানের কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তাদের ওপর কুরবানির ওয়াজিব কর্তব্য আরোপিত হয়। ঈদ যেমন আনন্দের; তেমনি ইবাদতেরও। ঈদের দিনে বেশ কিছু আমল রয়েছে, যার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। প্রিয় নবীজি (সা.)- এর সুন্নত অনুসরণ করে পবিত্র ঈদুল আজহা ও কুরবানি করা সব মুসলিমের কর্তব্য।
পরিচ্ছন্নতা ও উত্তম পোশাক পরা : অন্যদিনের তুলনায় ঈদের দিন সকাল-সকাল ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া এবং গোসল ও পবিত্রতা অর্জন করা সুন্নত। মুসলমানদের প্রধান দুই ধর্মীয় উৎসব তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সুন্দর ও সাধ্যের ভেতর সবচেয়ে উত্তম পোশাক পরিধান করা সুন্নত। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন, নবীজি দুই ঈদের দিন সবচেয়ে সুন্দর ও উত্তম জামাটি পরিধান করতেন। তার একটি বিশেষ আবায়া ছিল, যা তিনি দুই ঈদে ও জুমাতে পরতেন। হাদিস বর্ণিত আছে, নবী করিম (সা.) প্রতিটি ঈদে ডোরাকাটা পোশাক পরিধান করতেন (বায়হাকি, হাদিস : ৬৩৬৩)।
সকালে পানাহার থেকে বিরত থাকা : ঈদগাহে যাওয়ার আগে পানাহার থেকে বিরত থাকা সুন্নত। ঈদুল আজহার দিন পানাহার ছাড়া ঈদগাহে যাওয়া ও নামাজের পর নিজের কুরবানির গোশত দিয়ে প্রথম খাবার গ্রহণ করা সুন্নত। নবীজি (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন না। আর কুরবানির দিন নামাজের পূর্বে খেতেন না।
ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবির বলা : ঈদের দিন বেশি-বেশি তাকবির পাঠ করে আল্লাহকে ডাকার মধ্যেই প্রকৃত আনন্দ। ঈদগাহে যাওয়ার সময় ও ঈদের দিন পুরুষরা উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করবে। আর মেয়েরা পাঠ করবে নীরবে। পবিত্র কুরআন কারিমে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যাতে তোমরা গণনা পূর্ণ করো এবং তোমাদের হেদায়াত দান করার দরুণ আল্লাহ তায়ালার মহত্ত্ব বর্ণনা করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)। জিলহজের নয় তারিখ ফজরের পর থেকে তের তারিখ আসরের সালাত পর্যন্তÍ মোট পাঁচ দিন তাকবির পাঠ করবে।
ঈদগাহে যাতায়াতের পথ পরিবর্তন করা : ঈদগাহে যাতায়াতের রাস্তা পরিবর্তন করা সুন্নত। যাওয়ার সময় এক রাস্তা দিয়ে গমন করা এবং ফেরার সময় অন্য রাস্তা ব্যবহার করা সুন্নত। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবীজি (সা.) ঈদের দিন ঈদগাহে আসা-যাওয়ার রাস্তা পরিবর্তন করতেন। (বুখারি : ৯৮৬)
পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন করা : কোনো ধরনের অপারগতা ও অক্ষমতা না থাকলে, পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নত। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন করতেন এবং পায়ে হেঁটে ঈদগাহ থেকে ফিরতেন। (তিরমিজি : ১২৯৫)
ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা : ঈদের দিন একে অন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নত। হাদিসে বর্ণিত আছে, জুবাইর ইবনু নুফাইর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’, আল্লাহ আমার ও আপনার যাবতীয় ভালো কাজ কবুল করুন। (ফাতহুল কাদিও : ২/৫১৭)
সুন্দরভাবে পশু জবাই করা : কুরবানির পশু জবাই করার যন্ত্র ভালোভাবে ধার দেওয়া, প্রাণীকে সুন্দরভাবে জবাইয়ের স্থানে নিয়ে যাওয়া ও উত্তমভাবে জবাই করা মুস্তাহাব। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করাকে আবশ্যক করেছেন। অতএব তোমরা কাউকে হত্যা করলে ভালোভাবে করো। জবাই করলে উত্তম পন্থায় জবাই করো। তোমাদের সবাই যেন ছুরি ধার করে নেয় এবং তার জবাইকৃত পশুকে আরাম দেয়।’ (মুসলিম : ৫১৬৭)
সম্ভব হলে নিজে জবাই করা : জবাইয়ে পারদর্শী হলে নিজের কুরবানির পশু নিজেই জবাই করা সুন্নত। অপারগ হলে অন্য মুসলিমকে দায়িত্ব দেওয়া যায়। জবাইকারীর মুখ কেবলার দিকে থাকা এবং ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর’ বলে জবাই করা মুস্তাহাব। আনাস (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) ভেড়ার ওপর পা রেখে আল্লাহর নামে নিজ হাতে জবাই করেছেন (বুখারি : ৫২৩৮)। বর্ণিত আছে, ‘বিদায় হজে নবীজি ১০০ উট কুরবানি করেন। তন্মধ্যে তেষট্টিটি উট নিজ হাতে জবাই করেন। বাকিগুলো জবাই করতে আলি (রা.)- এর কাছে দেন।’ (মুসলিম : ৩০০৯)।
কুরবানির মূল কথা হলো ত্যাগ। সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কুরবানি দিয়ে দরিদ্র প্রতিবেশীদের মধ্যে এর মাংস বিতরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। পরিতাপের বিষয়- এ দেশের অনেকের কাছে ধর্মের মতো আধ্যাত্মিক একটি বিষয়ও পরিণত হয়েছে লোকদেখানো আচারে। প্রতিযোগিতা করে পশু কেনা, মাংস খাওয়া এবং মাসের পর মাস ডিপফ্রিজে জমিয়ে রাখা ইদানীং আমাদের কালচারে পরিণত হয়েছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না সেগুলোর গোশত এবং রক্ত বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ কাজেই কুরবানি কোনো লোকদেখানো বা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। আল্লাহ তায়ালা প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করতে বলেছেন। আমরা তার আদেশ পালন করব হৃদয় থেকে, মানুষকে দেখানোর জন্য নয়। কুরবানির মহিমা আমাদের অন্তরলোকের সংকীর্ণতা ধুয়ে দেয়। ইসলামের এই মহান চেতনাকে ধারণ করে ত্যাগ, ধৈর্য ও তিতিক্ষার ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার সেই শিক্ষায় আমরা ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনকে গৌরবান্বিত করে তুলতে পারি। ঈদের সীমাহীন আনন্দ উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশে নিজেকে নিবেদিত করে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ত্যাগের, ভ্রাতৃত্বের ও সম্প্রীতির চর্চার মাধ্যমে ঈদ উদযাপনকে আমরা সার্থক করে তুলতে পারি। ঈদ হোক মুসলিম উম্মাহর অনাবিল সুখ-শান্তি ও চিরস্থায়ী মুক্তির সোপান।

