‘এআই মামলা’ আতঙ্ক : পুলিশ বলছে- ‘ভূয়া’

প্রবাহ রিপোর্ট : ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে সিলেটে বেড়াতে এসে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন ঢাকার একটি তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দেবজ্যোতি দে। ব্যস্ত নগরজীবনের ক্লান্তি দূর করতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য সিলেটে এসেছিলেন তিনি। নগরের শাহজালাল উপশহরে আত্মীয়ের বাসায় অবস্থানকালে হঠাৎ একটি খুদে বার্তা আসে তার মোবাইল ফোনে। বার্তায় দাবি করা হয়, ‘ইন্টেলিজেন্ট ভিডিও নজরদারি ব্যবস্থায়’ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে তার ব্যবহৃত গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুদে বার্তাটি পড়ে প্রথমে কিছুটা বিস্মিত হলেও পরে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে পড়েন দেবজ্যোতি। কারণ, বার্তায় যেদিন ট্রাফিক আইন ভঙ্গের অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেদিন তার গাড়িটি ঢাকার নিজস্ব গ্যারেজেই রাখা ছিল। তিনি নিজেও তখন পরিবারের সঙ্গে সিলেটে অবস্থান করছিলেন। অথচ, বার্তায় বলা হয়, ঢাকায় এআইভিত্তিক ক্যামেরার নজরদারিতে তার গাড়ি আইন লঙ্ঘনের সময় ধরা পড়েছে।
দেবজ্যোতি দে বলেন, “প্রথমে আমি বিষয়টিকে সত্যিই ভেবেছিলাম। কারণ, কয়েকদিন ধরে সংবাদমাধ্যমে ঢাকায় এআই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক মামলা কার্যক্রম চালুর খবর দেখছিলাম। হঠাৎ এমন একটি মেসেজ পেয়ে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। পরে দেওয়া ওয়েবসাইটে গিয়ে বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে সন্দেহ হয়। শেষ পর্যন্ত বিআরটিএতে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হই, এটি প্রতারণার অংশ।”
শুধু দেবজ্যোতি নন, সম্প্রতি সিলেটের বিভিন্ন এলাকার অনেক গাড়ির মালিক একই ধরনের খুদে বার্তা পেয়েছেন। প্রতারকরা নিজেদের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) পরিচয় দিয়ে এসব বার্তা পাঠাচ্ছে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, ‘ইন্টেলিজেন্ট ভিডিও নজরদারি ব্যবস্থার’ মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর পর একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে জরিমানা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
কিছু বার্তায় আবার ‘ইলেকট্রনিক এভিডেন্স ইমেজ’ এবং ‘প্রশাসনিক জরিমানা বিজ্ঞপ্তি’ দেখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ভাষা ও উপস্থাপনা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই এটিকে সরকারি বার্তা বলে মনে করেন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সিলেট নগরের ডাকবাংলো রোড এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা গৌতম চক্রবর্তী। তিনি বলেন, “ঢাকায় এআই ক্যামেরা চালুর খবর আগে থেকেই জানতাম। তাই, মেসেজটি দেখে ভয় পেয়ে যাই। মনে হচ্ছিল, সত্যিই হয়তো কোনো মামলা হয়েছে। পরে খেয়াল করলাম, যে ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হয়েছে, সেটি কোনো সরকারি ওয়েবসাইটের মতো নয়। এর পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, এটি সম্পূর্ণ ভুয়া।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারকরা বিআরটিএর আদলে নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে বিভিন্ন নম্বর থেকে গাড়ির মালিকদের কাছে জরিমানা ও মামলার বার্তা পাঠাচ্ছে। এমন কয়েকটি বার্তার স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, মেসেজগুলো বিদেশি নম্বর থেকে পাঠানো হয়েছে।
অন্তত দুটি নম্বর থেকে পাঠানো বার্তা যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলোর আন্তর্জাতিক কলিং কোড (+৬৩), যা ফিলিপাইনের জন্য ব্যবহৃত হয়। নম্বর দুটি হলো +৬৩৯২৮৬২৯৬৩০৬ এবং +৬৩৯৪৯৬৫৮৯১৮৫। যদিও বার্তার ভাষা ও বিষয়বস্তু ভিন্ন, তবে উদ্দেশ্য একই—গ্রাহককে একটি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করানো এবং জরিমানা পরিশোধে উদ্বুদ্ধ করা।
অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, এসব বার্তায় ব্যবহৃত ওয়েবসাইটগুলোর সঙ্গে বিআরটিএর প্রকৃত ওয়েবসাইটের কোনো মিল নেই। সরকারি ওয়েবসাইট সাধারণত ‘মড়া.নফ’ ডোমেইনে পরিচালিত হয়। কিন্তু, প্রতারকদের ব্যবহৃত ওয়েবসাইটে অপরিচিত ও সন্দেহজনক ডোমেইন ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সহজেই জালিয়াতির ইঙ্গিত দেয়।
প্রযুক্তি বিশ্লেষক খায়রুল আলম বলেছেন, “এ ধরনের প্রতারণার সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো বার্তা প্রেরণের নম্বর। সরকারি প্রতিষ্ঠান সাধারণত নিজস্ব নম্বর বা নির্ধারিত শর্টকোড ব্যবহার করে। কিন্তু, বিদেশি নম্বর থেকে পাঠানো এসব বার্তা স্পষ্টভাবেই প্রতারণার অংশ।”
তিনি বলেন, “বর্তমানে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ে যেমন আগ্রহী, তেমনি কিছুটা উদ্বিগ্নও। প্রতারকেরা সেই মানসিক অবস্থাকে কাজে লাগাচ্ছে। তারা এমনভাবে বার্তা তৈরি করছে, যাতে মানুষ ভয় পেয়ে দ্রুত লিংকে প্রবেশ করে অথবা অর্থ পরিশোধ করে ফেলে।”
তার মতে, এসব ওয়েবসাইট শুধু অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই নয়, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের জন্যও ব্যবহার হতে পারে। ব্যবহারকারীর মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের তথ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ বিষয়ে বিআরটিএর বক্তব্য জানতে সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে প্রতারণা বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, “ঢাকার বাইরে এখনো এআইভিত্তিক ট্রাফিক মামলা কার্যক্রম চালু হয়নি। ফলে, সিলেটে এ ধরনের মামলার প্রশ্নই আসে না। প্রতারকরা মানুষের অজ্ঞতা ও আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।”
সুদীপ্ত রায় আরো বলেন, “কেউ যেন এ ধরনের বার্তায় বিভ্রান্ত না হন, সে বিষয়ে আমরা সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করছি। কোনো লিংকে প্রবেশ করার আগে এবং কোনো ধরনের অর্থ পরিশোধের আগে অবশ্যই বিষয়টি যাচাই করতে হবে।”
তিনি জানান, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার ধরন এখন অনেক বদলে গেছে। আগে লটারি জেতা, চাকরি দেওয়ার প্রলোভন কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার ভয় দেখিয়ে প্রতারণা করা হতো। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ‘এআই নজরদারি‘, ‘ডিজিটাল মামলা’ এবং ‘স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম’-এর মতো আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শব্দ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও সতর্কতামূলক বার্তা দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।



