১০ বছর পর দেশে ফিরে বাড়ি ফেরা হলোনা প্রবাসীর

# ফরিদপুরে দুর্ঘটনায় নিহত ৫ জনের ৪ জনই একই পরিবারের #
# মা, বোন ও ছোটভাইসহ সড়ক দূর্ঘটনায় ঝরে গেল প্রাণ #
মাদারীপুর প্রতিনিধি ঃ প্রায় এক দশক ধরে প্রবাস জীবনের কঠিন সংগ্রাম। পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে তরুণ বয়সেই মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন আরিফ ইসলাম। দীর্ঘ ১০ বছর পর দেশে ফিরছিলেন নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে। পরিবারও অপেক্ষায় ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের। ঘরে ঘরে চলছিল বিয়ের প্রস্তুতি, আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে ছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকের মাতমে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আরিফকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি নিজে, তার মা, বোন ও ছোট ভাই। একটি পরিবারের স্বপ্ন, আশা আর ভবিষ্যৎ এক রাতেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সোমবার (১ জুন) রাত পৌনে ৪টার দিকে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম ফ্লাইওভার এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গ্যাস সিলিন্ডারবোঝাই একটি বিকল ট্রাক সড়কে দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে যাত্রীবাহী একটি প্রাইভেটকার ট্রাকটির পেছনে সজোরে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন। নিহতরা হলেন- যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী নূর জাহান বেগম (৫০), তাঁদের মেয়ে আয়শা খাতুন (২৮), মালয়েশিয়া প্রবাসী ছেলে আরিফ ইসলাম (২৫) এবং প্রাইভেটকার চালক জাহিদ হোসেন (৩২)। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন শহিদুল ইসলামের ছোট ছেলে রাকিবুল ইসলাম (১৮), আয়শার ছেলে আশরাফুল হুসাইন (৭) এবং মেয়ে তাসফিয়া খাতুন (৩)। আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (২ জুন) সকালে রাকিবুলের মৃত্যু হয়। এনিয়ে একই পরিবারের মা, মেয়ে ও দুই ছেলেসহ চারজন এবং গাড়িচালকসহ মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে দুই শিশু আশরাফুল ও তাসফিয়া। চিকিৎসকদের ভাষ্য, তারা বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত। নিহত আয়শা খাতুনের স্বামী ইলিয়াস সরদার বলেন, আরিফ প্রায় ১০ বছর আগে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিল। অনেক কষ্ট করে পরিবারের ঋণ পরিশোধ করেছে, ঘরবাড়ির কাজ করেছে। এবার দেশে এসে বিয়ে করবে-এ নিয়ে পুরো পরিবার আনন্দে ছিল। তিন মাসের ছুটি নিয়ে দেশে ফিরছিল সে। তাকে আনতে শাশুড়ি, আমার স্ত্রী, শ্যালক রাকিবুল এবং আমার দুই সন্তান বিমানবন্দরে গিয়েছিল। কিন্তু তারা আর ঘরে ফিরতে পারল না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমার শ্বশুর একজন ইজিবাইকচালক। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তার ছোট সংসার। এক রাতেই স্ত্রী, দুই ছেলে ও মেয়েকে হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেলেন। এতদিন পর ছেলেকে বরণ করে নেওয়ার আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে আজীবনের বেদনায়। স্থানীয়রা জানান, আরিফের দেশে ফেরাকে ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরেই পরিবারে উৎসবের আবহ ছিল। বিয়ের কথাবার্তা প্রায় চূড়ান্ত ছিল। আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেই তার আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার পথেই সব স্বপ্ন থেমে যায় নির্মম এক সড়ক দুর্ঘটনায়। শিবচর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, ঘটনাস্থলে নিহতদের লাশের সুরতহাল সম্পন্ন করা হয়েছে। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে লাশ হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্তও চলছে। একটি পরিবারের বহু বছরের অপেক্ষা, প্রবাসীর স্বপ্নের ঘরে ফেরা, আর বিয়ের আনন্দ-সবকিছুই এক মুহূর্তে গ্রাস করেছে সড়কের নির্মম বাস্তবতা। আরিফের ঘরে ফেরা হলো ঠিকই, তবে জীবিত নয়-নিথর দেহ হয়ে। সেই সঙ্গে নিভে গেল একটি পরিবারের চারটি প্রাণ, রেখে গেল অসীম শোক আর অপূরণীয় শূন্যতা।



