জনতা-পুলিশ সংঘর্ষে রণক্ষেত্র লালমনিরহাট : এসপিসহ আহত ২০

# শিশুকে হত্যার পর মাটিচাপা #
আসামি ছিনিয়ে নেওয়াকে ঘিরে উত্তেজনা
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় নিখোঁজের এক দিন পর এক শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার কেন্দ্র করে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। উত্তেজিত জনতা ডিসি-এসপিসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্তত তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়লে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এদিকে জনতার সঙ্গে সংঘর্ষে এসপি-ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ডিসির গাড়িসহ প্রশাসনের সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আদিতমারী থানার ওসিকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে ঘটনা ঘটে।
নিহত নন্দিনী কান্ত রায় (৭) ওই গ্রামের নলিনী কান্তের মেয়ে। আটকরা হলেন ওই এলাকার রণজিৎ কুমার ও তার ছেলে বিধান চন্দ্র রায় (২২)।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, সোমবার বিকেল থেকে হঠাৎ নিখোঁজ ছিল শিশু নন্দিনী। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান মেলেনি। মঙ্গলবার সকালে পরিবারের লোকজন ও স্থানীয়রা পুনরায় খুঁজতে বের হন। একপর্যায়ে বাড়ির পাশে একটি ভুট্টাক্ষেতে নতুন খোঁড়া নরম মাটি দেখে তাদের সন্দেহ হয়। সেখানে মাটি খুঁড়তেই নন্দিনীর বস্তাবন্দি লাশ বেরিয়ে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকসেবী বিধান চন্দ্র ওই শিশুকে ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণ ও হত্যার পর লাশ গুম করতে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল।
লাশ উদ্ধারের পর জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যায় অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রকে ওই ভুট্টাক্ষেত থেকে কোদাল হাতে ফিরতে দেখেছিলেন এক প্রতিবেশী। এই তথ্যের ভিত্তিতে বিক্ষুব্ধ জনতা বিধানের বাড়িতে চড়াও হয়। গ্রেপ্তার এড়াতে বিধান নিজের ঘরের বাইরে তালা লাগিয়ে ভেতরে আত্মগোপন করেছিলেন। জনতা তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে তাকে ধরে পিটুনি দেওয়ার চেষ্টা করে।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিধানকে নিজেদের হেফাজতে নিলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে জনতা। তারা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেরা বিচার করার দাবিতে ‘মব’ তৈরি করে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। খবর পেয়ে লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান ও ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থলে গেলে তারাও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পর্যায়ক্রমে সদর থানা, কালীগঞ্জ থানা, ডিবি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান এবং বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমামও কর্মকর্তাদের নিয়ে সেখানে যান। কিন্তু উত্তেজিত জনতা কাউকেই তোয়াক্কা না করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সবাইকে প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে এবং দফায় দফায় হামলা চালায়।
পরে পুলিশ ও বিজিবি তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং অবরুদ্ধ কর্মকর্তা ও আটক ব্যক্তিদের নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করার চেষ্টা করে। এ সময় শেষ দফায় প্রশাসনের বহর লক্ষ্য করে চারপাশ থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে জনতা। এতে এসপি আসাদুজ্জামান ও ওসি নাজমুল হকসহ ২০ জন আহত হন। ভেঙে চুরমার হয়ে যায় জেলা প্রশাসকের গাড়ি ও পুলিশের প্রিজন ভ্যানসহ সাতটি গাড়ি।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, উত্তেজিত জনতার ইটের আঘাতে আমি নিজেও আহত হয়েছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৩ রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। কয়েকজন পুলিশ আহত এবং আমাদের বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার কারণে আদিতমারী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিশু হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ও অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র এবং তার বাবাকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় আরও একটি মামলা দায়ের করা হবে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, নৃশংস এই হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আপাতত ওসিকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।



