জাতীয় সংবাদ

মৃত্যুদ- নিয়ে কনডেম সেলে এক দশক: শিউলি পর এবার মুক্তি পাচ্ছেন মাশকুরা

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ স্বামী হত্যার দায়ে মৃত্যুদ- মাথায় নিয়ে কনডেম সেলে এক দশকেরও বেশি সময় কাটানোর পর মুক্তি পাওয়া আসামির তালিকায় যুক্ত হলো আরও এক নারীর নাম। ঢাকার পল্লবীর ভাড়াটিয়া সালেহা খাতুন শিউলির পর এবার মুক্তির আদেশ পেয়েছেন সিলেটের তিন সন্তানের জননী ফাতিহা মাশকুরা। স্বামীকে খুনের অভিযোগে ২০১৫ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ফাতিহা। পরের বছর ২০১৬ সালে তার মৃত্যুদ- হয় বিচারিক আদালতে। সেই থেকে শুরু হয় হার্টে রিং পরানো এই নারীর কনডেম সেলের জীবন। বিচারের ধারাবাহিকতায় হাইকোর্টেও তার মৃত্যুদ- বহাল হয়। কিন্তু বিচারের শেষ ধাপ তথা আপিল বিভাগে এসে আইনি যুক্তিতে খালাস পেলেন মাশকুরা। শুধু খালাসই নয়, তার মুক্তির জন্য অ্যাডভান্স অর্ডার (অবিলম্বে মুক্তির আদেশ) পাঠাবেন সর্বোচ্চ আদালত। ঘটনার শুরু যেভাবে ঃ এক দশকেরও বেশি সময় আগে ২০১৫ সালের ১৮ মে সিলেটের ধোপাদিঘির উত্তরপাড় আঞ্চলিক শাখা তাবলিগের আমির ইব্রাহিম খলিলের নিজ বাসার শয়নকক্ষ থেকে তার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ উদ্ধারের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার স্ত্রী ফাতিহা মাশকুরাকে আটক করে পুলিশ। এরপর মাশকুরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে সেসময় জানানো হয়। পরে কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করা হয়। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদ- ঃ ২০১৫ সালের ২৪ আগস্ট ফাতিহার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। বিচার শেষে ২০১৬ সালের ৬ জুন সিলেট মহানগর দায়রা জজ আকবর হোসেন মৃধা একমাত্র আসামি খলিলের স্ত্রী ফাতিহা মাশকুরাকে মৃত্যুদ- দেন। ফলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কনডেম সেলে। এরপর মৃত্যুদ-াদেশ অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পাশাপাশি আসামি জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন। হাইকোর্টে মৃত্যুদ-াদেশ বহাল ঃ ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি মৃত্যুদ-াদেশ অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ এবং আসামির আপিল খারিজ করে হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদ-াদেশ বহাল রাখেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেন মাশকুরা। আপিলে খালাস ঃ মাশকুরার আপিলের শুনানি শেষে বুধবার (১৭ জুন) রায় দেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ। রায়ে তার আপিল মঞ্জুর করে খালাস দেন। একই সঙ্গে মুক্তির জন্য অ্যাডভান্স অর্ডার পাঠাবেন বলে জানান। আদালতে আপিলকারী মাশকুরার পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক রুশদ হক। খালাসে যেসব যুক্তি ঃ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, এ মামলাটার কোনো এভিডেন্স (প্রমাণ) নেই। শুধু একটামাত্র জিনিস ছিল, সেটা হলো ১৬ তারিখ রাতের ঘটনা। ১৮ তারিখ সকালে পুলিশ আসামিকে সঙ্গে করে নিয়ে এলো। আনার পরে ১৮ তারিখ নিজেদের হেফাজতে রেখে একটা স্বীকারোক্তি ভিডিও করলো পুলিশ। পরে ১৯ তারিখ তাকে বিচারকের কাছে পাঠানো হয় স্বীকারোক্তি রেকর্ড করার জন্য। প্রসিকিউশনের পক্ষে তাকে আটকে রাখার জন্য এইটাই হলো একমাত্র এভিডেন্স বা ম্যাটেরিয়ালস, তাকে শাস্তি প্রদানের একমাত্র উপকরণ। এই স্বীকারোক্তি ছাড়া আর কোনো কিছু নেই। পরে তিনি আবার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারে আবেদন দিয়েছিলেন শাহজাহান বলেন, জবানবন্দির ওপরে সাজা থাকবে কি থাকবে না, সেটা নিচের কোর্ট ও হাইকোর্টকে যথাযথভাবে বোঝাতে পারিনি। তবে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ধৈর্য সহকারে শুনেছেন। সাধারণত এত দীর্ঘ শুনানি হয় না। কারণ সময় কম, মামলা প্রচুর। কোর্টকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, এই স্বীকারোক্তির যে ভিডিও রেকর্ড করলেন তদন্ত কর্মকর্তা, এটার কোনো ইনস্ট্যান্স নেই। গত ৫০ বছরে এমন কোনো রেকর্ড নেই যে বিচারকের কাছে দেওয়ার আগে এমন স্বীকারোক্তি ভিডিও করা হয়েছে। থ্রেট হিসেবে এ ভিডিও করা হয়েছে বলে মনে করি। ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে যেন এরকম হুবহু বলে। এটা আমি কোর্টে বারবার উপস্থাপন করেছি। তিনি আরও বলেন, নথিতে একজন বিচারপতি দেখলেন, যখন স্বীকারোক্তি রেকর্ড করা হয়, তখন একজন নারী পুলিশ উপস্থিত ছিলেন। কারণ পুলিশের উপস্থিতিতে কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হবে না। এটা আমাদের সুপ্রিম কোর্ট, ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডার্সে যে ফরম্যাট দিয়েছে, সেই ফরম্যাটে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করতে হবে। পুলিশের উপস্থিতি থাকলে জবানবন্দির কোনো মূল্য নেই। এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মতে, এ মামলায় একজনও চাক্ষুষ সাক্ষী ছিল না। ভিকটিম যে ঘরে শোয়া ছিলেন, সেখানে ঘরের চালের একটা টিন খোলা ছিল। এটাতে মনে হয়, ওপরের টিনের চাল দিয়ে কেউ এসে মেরে গেছে। সুরতহালে বলা হয়েছে, আসামি বাচ্চাসহ অন্য ঘরে ছিলেন। এছাড়া একজন নারী, যার হার্টে দুইবার রিং পরানো ছিল; প্রকারান্তরে যিনি খুন হন তিনি তার স্বামী, সুঠামদেহী ৫২ বছরের মানুষ। কোনো অবস্থাতেই ওই নারীর একার পক্ষে মাথায় রেলওয়ের স্লিপার দিয়ে বাড়ি দেওয়া, পেটে তিনটা ছুরিকাঘাত এবং জবাই করা অসম্ভব। কারণ নারীদের শরীরে শক্তি কম। আবার তিন সন্তানের মা এবং হৃদরোগে আক্রান্ত। তিনি জানান, ভিকটিমের হাত-পা রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। হাত রশি দিয়ে বাঁধতে গেলে লোকটা জেগে যেত। জেগে যাওয়ার পরে তিনি (স্বামী) এভাবে মার খেয়ে চুপ করে বসে থাকতেন? এগুলো কোর্ট দেখলেন এবং চিন্তা করলেন। রাষ্ট্রপক্ষ বলেছেÑএটা যেহেতু পাওয়া গেছে (স্বীকারোক্তির সময় পুলিশের উপস্থিতি), এই স্বীকারোক্তির গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। এই স্বীকারোক্তি ছাড়া এ মামলায় আর কিছু নেই। এরপর আদালত খালাস দিয়ে আসামির মুক্তির জন্য অ্যাডভান্স অর্ডার পাঠানোর কথা বলেছেন। মাশকুরার মতো ভুগেছেন শিউলিও ঃ তদন্তে গুরুতর ঘাটতিতে এভাবে কনডেম সেলে বছরের পর বছর পার করা মাশকুরা একা নন। তার মতো প্রায় ১২ বছর জেল খেটে স্বামী হত্যার দায় থেকে মুক্ত হয়েছেন সালেহা খাতুন শিউলি নামে এক নারীও। আরও পড়–ন: তদন্তে গুরুতর ঘাটতি: ১২ বছর জেল খেটে স্বামী হত্যার দায় থেকে মুক্ত হলেন শিউলি ঃ ১৪ বছর আগে ২০১২ সালের অক্টোবরে ঢাকার পল্লবীতে স্বামী মহসিনকে চেতনানাশক খাইয়ে গলা কেটে হত্যার দায়ে শিউলীর মৃত্যুদ- হয়। ওই মামলায় মহসিনের ভাইয়ের করা মামলায় বিচার শেষে ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকার ৪ নং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল একমাত্র অভিযুক্ত সালেহা খাতুন শিউলিকে (শিউলি) স্বামী হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে দ-বিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদ-ে দ-িত করেন। ওই রায় ও আদেশ অনুমোদনের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারায় বর্তমান ডেথ রেফারেন্স মামলা (১৬৮/২০১৭) হাইকোর্টে নিবন্ধিত হয়। শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স খারিজ করে তার আপিল মঞ্জুর করেন। দ-িত শিউলি খাতুনকে অন্য কোনো মামলায় আবশ্যক না হলে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেন হাইকোর্ট। সম্প্রতি সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পায়। ওই রায়ে উচ্চ আদালত বলেন, কেবল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে সাজা দেওয়া আইনসঙ্গত নয়; এর সমর্থনে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকতে হয়। কিন্তু এ মামলায় তদন্তে গুরুতর ঘাটতি ছিল। আদালতের মতে, ভিকটিমকে চেতনানাশক ওষুধ খাওয়ানোর দাবি যাচাইয়ে ভিসেরা পরীক্ষা করা হয়নি। এছাড়া রক্তমাখা তোষক ও ছুরির ফরেনসিক পরীক্ষার অভাব, সাক্ষ্য-প্রমাণে অসঙ্গতি এবং স্বীকারোক্তির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button