ঢাকায় হাঁকডাক দিয়েই বিক্রি হচ্ছে মাদক

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ গোপন স্পটের পাশাপাশি মাদক এখন নেমে এসেছে রাজপথে। ফেরিওয়ালা ও হকারদের মতো রাজধানীর মাদক কারবারিদের প্রকাশ্যে হাঁকডাক দিয়ে সর্বনাশা এসব পণ্য বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি অনলাইন অর্ডারে ‘হোম ডেলিভারিতেও’ পাওয়া যাচ্ছে মাদক। যেকোনো সময়ের চেয়ে ঢাকার বর্তমান মাদক পরিস্থিতি ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্ত। এর মধ্যে বড় একটি অংশই রাজধানী ঢাকার। এমন বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তাও বড় ধরনের হুমকিতে পড়ছে। মাদকের মতো ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। হকার-ফেরিওয়ালার মতো ডেকে ডেকে মাদক বিক্রি। ঢাকার মাদক বিক্রির সবচেয়ে হটস্পট হিসেবে এখন কুখ্যাতি আছে কারওয়ান বাজার সংলগ্ন রেললাইন এলাকার। সরেজমিনে সেখানে ঘুরে দেখা গেছে, কারওয়ান বাজার মাছ বাজার রেলক্রসিং থেকে নাখালপাড়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে। মাদক বিক্রেতারা ফেরিওয়ালা-হকারদের মতো ডেকে ডেকে বলছে- ‘কী লাগবে, গাঁজা না ইয়াবা?’। এ দৃশ্য দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হতে পারে এটি কোনো মাদকের স্বর্গরাজ্য। মাছ বাজার সংলগ্ন রেলক্রসিং মেইন সড়কে মাদক বিক্রেতারা হকারদের মতো যানবাহনে থাকা লোকজনের কাছে গিয়ে মাদক বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছে। বাবু, রাজুসহ কয়েকজন মাদক বিক্রেতা জানান, তারা অন্যের হয়ে মাদক বিক্রি করেন এবং নিজেরাও মাদক সেবন করেন। এভাবে মাদক বিক্রির পারিশ্রমিক হিসেবে প্রতিদিন তাদের কয়েকটি মাদকের পুরিয়া ও ২০০ টাকা খরচ দেওয়া হয়। মাদক বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, রেললাইনজুড়ে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ জন মাদক বিক্রেতা সক্রিয় রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের অধীনে আবার চার থেকে পাঁচজন করে বিক্রয়কর্মী রয়েছে। তবে মূল সরবরাহকারী কারা সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। কারওয়ান বাজারের এক মাছ ব্যবসায়ী জানান, এখানে শুধু মাদক বিক্রি হয় বললে ভুল হবে, মাদকের হাট বসে। রেললাইনের পাশে অল্প দূরত্ব পরপরই মাদক বিক্রেতাদের দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দশ হাত পরপরও মাদক বিক্রির কার্যক্রম চলতে দেখা যায়। প্রকাশ্যে এমন বেচাকেনা চলতে থাকায় এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। গোপন সূত্র নয়, প্রকাশ্য বাস্তবতা ঃ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বলেন, আগে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোর্সের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হতো। তখন বিক্রেতারা গোপনে মাদক বিক্রি করত। কিন্তু বর্তমানে তারা সড়কের সামনে, মানুষের চলাচলের মধ্যেই প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করছে। তিনি বলেন, গোপন সূত্রে জানা যায়Ñএই কথাটি এখন আর ব্যবহার না করলেই ভালো। কারণ কারওয়ান বাজার মাছ বাজার, রেললাইনে দাঁড়ালেই দেখা যায়, প্রকাশ্যে উচ্চস্বরে ডেকে ডেকে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। মাদকাসক্তি কী হারে ছড়াচ্ছে, তার নজির খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগ-মেরাদিয়া এলাকার একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র। ওই কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগে কয়েকটি এলাকা মিলিয়ে যেখানে ১০ জনের মতো মাদকাসক্ত চিকিৎসার জন্য আসতেন, বর্তমানে একটি এলাকা থেকেই ১০ থেকে ১২ জন মাদকাসক্ত চিকিৎসা নিতে আসছেন। তাদের মতে, পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে এবং অধিকাংশই ইয়াবা সেবনে আসক্ত। চিকিৎসাধীন কয়েকজন মাদকাসক্ত জানান, এখন আর মাদক সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্পটে যেতে হয় না। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলেই বাসার সামনে বা নির্ধারিত স্থানে মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়। মাদকের সহজলভ্যতায় আসক্তির হারও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি নিয়ে ঢাকা মহানগর তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বাংলানিউজকে বলেন, কারওয়ান বাজার রেললাইনের পাশে ঝুপড়ি ঘর উঠিয়ে দেওয়ার পরও তারা আবারও মাঝে মাঝে চলে আসে এবং মাদক বিক্রয় কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে। সেখানেও অভিযান চলমান আছে। তিনি আরও বলেন, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় একের পর এক অভিযানের কারণে মাদক বিক্রি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী ও বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা জেলহাজতে আছে। এ ছাড়া জেনেভা ক্যাম্পে সব সময় দৃষ্টি রাখা হচ্ছে এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও অভিযান চলমান আছে। ২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসের অনুষ্ঠানে বাংলানিউজের এক প্রশ্নের জবাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আবু সাঈদ মিয়া বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকের বিরুদ্ধে দিনে রাতে ২৪ ঘণ্টা কাজ করে চলেছে। এ ছাড়া অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযানের মাধ্যমেও মাদক নিয়ন্ত্রণের কাজ চলমান। মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য অবশ্যই জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। মাদকমুক্ত সমাজ এদেশের মানুষের প্রাণের দাবি। মাদক ব্যবসায়ীরা কি সত্যিই অপ্রতিরোধ্য? ঃ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত আছে, মাদক ব্যবসায়ীরা খুবই শক্তিশালী। তবে বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়। নীরবতার কারণেই তারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে জনগণ সচেতন ও জাগ্রত হলে মাদক ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবে না। এক কথায় জনতার নীরবতাই মাদক ব্যবসায়ীদের শক্তি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ও কঠোর তৎপরতার ফলে ২০১৯ সালে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ায় সুযোগ নিয়ে ব্যাপক হারে মাদক দেশে প্রবেশ করছে, বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে। তিনি বলেন, সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অভিযান পরিচালনা করলেও মাদক ব্যবসায়ীরা আবারও তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালে তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেত এবং তিন-চার দিন পর্যন্ত তাদের খুঁজে পাওয়া যেত না। পরে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হতো। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। তাদের কাজের ঘাটতি আছে বলেই অলিগলিতে এখন মাদক। এ ছাড়া মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। এলাকায় এলাকায় মাদক বিক্রিকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, কারা মাদকের হোলসেল বিক্রি করে, তা খুঁজে বের করা জরুরি, তবে সেটার পেছনে সময় নষ্ট করে আপাতত লাভ নেই। শহরে ছড়িয়ে থাকা খুচরা মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা গেলে মাদকের বাজার অনেকটাই সংকুচিত হবে। বদলে গেছে মাদকের ধরন ঃ সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মাদকের ধরন। ১৯৮০-এর দশক থেকে রাজধানী ঢাকায় মাদকের ব্যবহার ও ব্যবসা দ্রুত বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। সে সময় গাঁজা, আফিম ও চরস ছিল সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। ১৯৮৭ সালে গাঁজা সেবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে এর বিক্রি অব্যাহত থাকে। একইসঙ্গে চরস ও আফিমের ব্যবহারও বৃদ্ধি পায়। ৯০-এর দশকে দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে হেরোইন। রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে প্রকাশ্যে ও গোপনে এই মাদকের কেনাবেচা চলত। এরপর ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে যুবসমাজের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ফেনসিডিল। ঢাকার কিছু এলাকায় মাদকসেবীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ফেনসিডিল সংগ্রহ করতেন, যা সে সময়ের একটি উদ্বেগজনক চিত্র ছিল। ২০০০ সালের পরে মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারের জোরালো পদক্ষেপের কারণে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এলেও নতুন মাদক হিসেবে আবির্ভূত হয় ইয়াবা। ২০১৫ সালের দিকে তরুণ সমাজের মধ্যে সুনামির মতো ছড়িয়ে পড়ে ইয়াবা এবং দ্রুত দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ মাদক সমস্যাগুলোর একটিতে পরিণত হয়। বর্তমানে ইয়াবার পাশাপাশি নতুন মাদক হিসেবে যুক্ত হয়েছে ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’, এলএসডি এবং অন্যান্য সিনথেটিক মাদক। এসব অত্যন্ত আসক্তিকর এবং মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। নব্বইয়ের দশকের পর ঢাকা শহরে অন্তত ২০০ থেকে ২৫০টি মাদকের স্পট ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর স্পট হিসেবে পরিচিত ছিল আগারগাঁওয়ের বিএনপি বস্তি। সেখানে অভিযান চালাতে গেলে প্রায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হতো। এসব স্পট মূলত স্থানীয় সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এ ছাড়া মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, গাবতলী-বাগবাড়ী, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও টাউন হল এলাকা, হাজারীবাগ, রায়েবাজার, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরা, খিলগাঁও, গোপীবাগ মেথরপট্টি রেললাইন এলাকা, গোলাপবাগ, সিটি কলোনি, মতিঝিলের ফকিরাপুল কালভার্ট বস্তি ছিল মাদকের স্পট।



