৩৬ দিনের আন্দোলণে সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ন হয় কুয়েট

জুলাই আন্দোলণের দিনগুলি-১২
এম সাইফুল ইসলাম ঃ চব্বিশের ১২ জুলাই শুক্রবার। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুক্রবার ছুটির দিনেও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল শেষে শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। পহেলা জুলাই শুরু হওয়া ৩৬ দিনের আন্দোলণে সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ন হয় কুয়েট। ক্যাম্পাসে দুর্বার বাংলা নামক ভাস্কর্যের সামনে কোটা বিরোধী আন্দোলনে ব্যানার নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নেয়। ৭ জুলাই থেকে তারা প্রকাশ্যে আন্দোলনে আসে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন জাহিদুর রহমান, ওমর ফারুক, রাতুল হাসান। আন্দোলনরতরা জনমত সৃষ্টির জন্য ফেসবুকে একাধিক পোস্ট দেয়। পোস্টগুলো ডিলিট করার জন্য ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের মোবাইলে হুমকি ধামকি দেওয়া হয়। কুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে রুদ্রনীল সিংহ শুভ সভাপতি ও নিবিড় রেজা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৫ আগস্ট সরকারের পদত্যাগের পর ছাত্রলীগের অনেকেই ক্যাম্পাস ত্যাগ করে। সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগের হামলার আশঙ্কায় ৮ জুলাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ক্যাম্পাসে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি। শিক্ষকরা এদিন কর্মবিরতি পালন করে। খুলনা নগরীর বিভিন্ন স্থানে কোটা বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার খবর পেয়ে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ব্যানার নিয়ে শিববাড়ী মোড়ে অবস্থান ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করে। এ কর্মসূচিতে খুলনা বিশ^বিদ্যালয়, নর্দান ইউনিভার্সিটি, খুলনা ও বিএল কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। বেলা ১১টা থেকে তিনটা পর্যন্ত এখানে অবস্থা নিয়ে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করে। আন্দোলনকারীদের প্রধান স্লোগান ছিল ‘কোটা না মেধা’, ‘মেধা মেধা’। সেখানে দীর্ঘক্ষণ পুলিশ অবস্থান নেয়। ১৫ জুলাই ওমর ফারুক, মুশফিক মাহমুদ ফয়সাল ও রাইয়ান শারিফুল আন্দোলনকারীদের সাথে পরামর্শ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে যৌথভাবে রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহিদ হওয়ার খবর আন্দোলনকারীদের কানে কানে পৌঁছে যায়। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা খুবির শিক্ষার্থীদের সাথে যৌথভাবে জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে স্লোগান ওঠে ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। কুয়েটের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে, মোঃ জাহিদুর রহমান, মোঃ ওমর ফারুক, রাইয়ান শারিফুল, সাদাত, তানভীর মাহিম, মুশফিক মাহমুদ ফয়সাল এ দিনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। ১৮ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত এ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা খবির শিক্ষার্থীদের সাথে মিশে জিরোপয়েন্টে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। ১৯ জুলাই কর্তৃপক্ষ হল ত্যাগের নির্দেশ দিলে আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের মুখোমুখি হয়। উপাচার্য সাফ জানিয়ে দেন আমি তোমাদের অভিভাবক না, হয়ে থাকলে দায় দায়িত্ব তোমাদের। আন্দোলনরত শিক্ষার্থী শিহাবুল এহসান, শেখ মুজাহিদ, রাইয়ান শারিফুল ও হিমেল উপাচার্যের কাছে হল বন্ধের প্রত্যাহারের দাবি জানান। ৩১ জুলাই রয়্যাল চত্বর থেকে কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়। ২ আগস্ট জুম্মার নামাজের আগে নিউ মার্কেট সংলগ্ন বায়তুন নুর মসজিদে পৌঁছালে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের গুন্ডা বাহিনী আন্দোলনকারীদের ভেতরে প্রবেশ বাধা দেয়। অন্যান্য মুসল্লিদের বিরোধিতার কারণে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের উদ্যোগ সফল হয়নি। জুম্মা নামাজ আদায়ের পর শিক্ষার্থীদের সাথে জিরো পয়েন্টে রণক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। ৩ আগস্ট ক্যাম্পাসে তৎকালীন সংসদ সদস্য এস এম কামাল হোসেন, উপাচার্য ও সরকারপন্থি শিক্ষকরা বৈঠকের আয়োজন করলে আন্দোলনের পক্ষের শক্তি শিক্ষকদের বড় একটা অংশ তা বর্জন করে। ৪ আগস্ট এক দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা শিববাড়ীতে জড়ো হয়। এর আগে ২৯ জুলাই একই দিনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদের দর্শনে বিশ্বাসী শিক্ষক প্রফেসর ডঃ খন্দকার আফতাব হোসেন একই ডিপার্টমেন্টের যন্ত্রকৌশল ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক প্রফেসর ডঃ মোঃ আশরাফুল ইসলাম ছাত্রদের আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ার জন্য প্রকাশে ভূমিকা নেয়। ৩০ জুলাই ও ৪ আগস্ট শিক্ষকরা মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে। ছাত্রদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে এ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন যন্ত্রকৌশল ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর ডঃ মোঃ আশরাফুল ইসলাম ও প্রফেসর ডঃ হেলাল আল নাহিয়ান। এ অপরাধে উপাচার্য ৮জন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। ৫ আগস্ট স্থানীয় অধিবাসীরা স্টুডেন্ট ওয়েফেয়ার সেন্টারে আগুন দেয়। এর আগে সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শিববাড়ীতে বাঁধভাঙা জোয়ারের সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারীরা পথে পথে আনন্দ মিছিল করে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা হচ্ছে মোঃ জাহিদুর রহমান, রাতুল হাসান, মোঃ ওমর ফারুক, মুশফিক মাহমুদ ফয়সাল, রাইয়ান শারিফুল, ওবায়দুল্লাহ, মোহন, সাজ্জাদ হোসেন ফরহাদ, হিমেল, আরাফ, মেহেদী হাসান জীবন, শোভন রায়, শাহানা আক্তার, মোঃ আশিকুল ইসলাম, এনায়েতুল্লাহ বাবু, তাকিয়া তাসবিহ, সৈয়দ মোঃ আবু হাসান খালিদ, সুমাইয়া তাসনিম, গোফরান বান্না সহ আরও অনেকে (কেন্দ্রীয় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪)। আন্দোলনের পক্ষে ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি ডিপার্টমেন্টের পরিচালক প্রফেসর ডঃ আশরাফুল গনি ভূঁইয়া, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের প্রধান প্রফেসর ডঃ মোঃ আবু জাকির মোর্শেদ, ডঃ মোঃ শাহজাহান আলী, ডঃ এস এম মনিরুজ্জামান, ডঃ মোঃ রোকনুজ্জামান, গণিত ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর ডঃ মোঃ আবুল কালাম আজাদ, ডঃ এস এম তৌহিদ হোসেন, ডঃ মোঃ আলহাজ উদ্দিন, ডঃ মোঃ জাহিদুর রহমান, ডঃ মোঃ আশরাফুল আলম, ডঃ মোঃ হাসানুজ্জামান, পদার্থ বিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টের ডঃ মোঃ মাহবুব আলম, ডঃ মোঃ ইলিয়াস আক্তার, ডঃ মোঃ আজাদুজ্জামান, রসায়ন ডিপার্টমেন্টের ডঃ মোঃ আবু ইউসুফ, ডঃ মোঃ আব্দুল মতিন, ডঃ মোঃ হাসান মোর্শেদ, মানবিক বিভাগের ডঃ রাজিয়া খাতুন, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডঃ মোঃ শাহনুর আলম, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডঃ মাসরুরা মোস্তফাসহ আরও কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন প্রমুখ। আন্দোলনের বিপক্ষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা নেওয়ায় সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ডঃ মুহাম্মদ আলমগীর, সাবেক উপ-উপাচার্য প্রফেসর ডঃ সোবহান মিয়া ও ডঃ পিন্টু চন্দ্র শীল সাময়িকভাবে বরখাস্ত হয়েছেন। জুলাই-আগস্টের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে প্রফেসর মিহির রঞ্জন হালদার স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ তাকে প্রথম গ্রেড থেকে নামিয়ে দ্বিতীয় গ্রেডে স্থান দিয়েছে। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮জন শিক্ষক কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত ও ১৫ জনকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের ৭ হাজার ৮শ’ ৭৩ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ কোটা বিরোধী ও সরকার পতনের আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন।



