যমুনার তাণ্ডব কেড়ে নিয়েছে চরাঞ্চলবাসীর ঘুম

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে যমুনা নদী। নদীর অব্যাহত ভাঙনে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। নিশ্চিন্তপুর ও চরগিরিশ ইউনিয়নের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি গ্রামের মানুষের রাত কাটছে আতঙ্কে। কখন বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হবে-এই দুশ্চিন্তায় তাদের চোখে নেই ঘুম। গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া নদীভাঙন দেড় মাস ধরে অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন স্থাপনা। স্থানীয়দের দাবি, এরই মধ্যে দুই শতাধিক বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি শত শত বিঘা ফসলি জমি, গাছপালা ও যোগাযোগ অবকাঠামোও নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে ভাঙনের মুখে রয়েছে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা, বাজার এবং কয়েকশ বসতবাড়ি। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত এক মাসেই চরগিরিশ ফ্লাড সেন্টার বাজার থেকে ভেটুয়া এলাকা পর্যন্ত অন্তত দুই শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পুরো চরগিরিশ ইউনিয়নের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। চরগিরিশ ইউনিয়নের ছালাল গ্রামের কৃষক রইচ উদ্দিন বলেন, “প্রায় দেড় মাস ধরে ভাঙন চললেও কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রতিদিন আতঙ্কে থাকিÑকখন যে ঘরবাড়ি নদীতে চলে যায়। রাতেও নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি না।” চরগিরিশ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আল আমিন সরকার বলেন, “যেভাবে ভাঙন এগোচ্ছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পশ্চিম চরগিরিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও খুব শিগগির নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।” চরদোরতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন জানান, বিদ্যালয় ভবনটিও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এদিকে পশ্চিম চরগিরিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবনির্মিত তিনতলা ভবনটি এখন নদী থেকে মাত্র প্রায় ১০০ গজ দূরে। যেকোনো সময় সেটিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদী ভাঙ্গনে সিরাজগঞ্জ ঃ বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তরিকুল ইসলাম বলেন, যমুনা নদী বিদ্যালয়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। কাজিপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল হুদা জানান, ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা বিদ্যালয় ভবনটি নিলামের মাধ্যমে অপসারণের প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে যমুনার পানি বাড়লেও গত ২৪ ঘণ্টায় কিছুটা কমেছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে কাজিপুরের মেঘাই পয়েন্টে যমুনার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৮৫ মিটার, যা ২৪ ঘণ্টায় ৪ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ হার্ডপয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৩২ মিটার। সেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় পানি ৫ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ভাঙনকবলিত মানুষের জন্য উপজেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা থেকে ৮৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের জন্য আরও সহায়তা বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, নিশ্চিন্তপুর এলাকার ভাঙনরোধে জিওব্যাগ ফেলে জরুরি প্রতিরোধকাজ চলমান রয়েছে। তবে চরাঞ্চলের স্থায়ী সুরক্ষার জন্য বৃহৎ পরিসরের একটি প্রকল্প প্রয়োজন। এ বিষয়ে সমীক্ষা শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হবে


