একদিন আগেই স্বাধীনতার স্বাদ পায় খুলনাবাসি

জুলাই আন্দোলনের দিনগুলি-৩৫
এম সাইফুল ইসলাম ঃ সারাদেশে ৫ আগস্ট বিজয় উল্লাস হলেও খুলনা জেলা ৪ আগস্টেই চূড়ান্ত বিজয়ের স্বাদ লাভ করে। যার অংশ হিসেবে খুলনার আওয়ামী দুর্গ হিসেবে খ্যাত পতিত শেখ হাসিনার চাচা শেখ আবু নাসেরের বাড়ি ‘শেখ বাড়ি’ ও আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট খুলনা প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্র, জেলা পরিষদসহ আওয়ামী বন্দনায় রত প্রতিষ্ঠানগুলোতে দফায় দফায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একইসাথে নগরীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যও ভাঙচুর করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবিতে ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে চব্বিশের ৪ আগস্ট বেলা পৌনে ১১টার দিকে নগরীর শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে ছাত্র-জনতা। এদিন আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় মিছিল ও বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। আটকে দেওয়া হয় মোড়ের চতুর্দিকের চলাচলের পথ। আন্দোলনকারীদের স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল ছিল শিববাড়ি মোড়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ওইদিন বেলা ১১ টার দিকে ক্যাম্পাস থেকে একটি মিছিল নিয়ে নগরীর শিববাড়িতে যোগ দেয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ লোয়ার যশোর রোডের খুলনা মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে তৎকালীন খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতি ও সদর থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে তাদের ওপর হামলার চেষ্টা করে। এ সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় গণ-মাধ্যমকর্মি এম সাইফুল ইসলাম গুলি করার ভিডিও করতে গেলে তাকে লক্ষ করে গুলি করে। এসময় তার মোবাইল ছিনিয়ে নেয় আওয়ামী ও ছাত্রলীগের অস্ত্রধারি সন্ত্রাসিরা।
এর পরই আওয়ামী লীগ অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভকারীরা। এ সময় খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমডিএ বাবুল রানা এবং নগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ শাহাজালাল হোসেন সুজনকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে আন্দোলনকারীরা। একই দিন দুপুরে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নগরীর শেরে বাংলা সড়কের ‘শেখ বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত সেসময়কার শেখ হেলাল উদ্দীন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলের বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করে।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল থেকে লোয়ার যশোর রোডের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কিছু আন্দোলনকারী পিকচার প্যালেস মোড় থেকে অগ্রসর হতে চাইলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাদের ধাওয়া দেয়। এ সময় দুই পক্ষের ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে ককটেল ও গুলির শব্দ পাওয়া যায়। এ সময় আন্দোলনকারীদের ধাওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পিছু হটে। আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং আসবাবে আগুন ধরিয়ে দেয়। কার্যালয়ের নিচে বেশকিছু মোটর সাইকেলেও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের পর আন্দোলনকারীরা নৌপরিবহণ মালিক গ্রুপের ভবনে ভাঙচুর চালায়। শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সোহেল সংগঠনটির সভাপতি ছিল। পরে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ নগর ভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে ভবনের কিছু কাচ ভেঙে যায়। তারা জেলা পরিষদ কার্যালয়ে প্রবেশ করে সামনে থাকা ৪টি মোটর সাইকেলেও আগুন ধরিয়ে দেয়।
দুপুর দেড়টায় তারা খুলনা প্রেসক্লাবে ভাঙচুর চালায়। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিতে আরেক দফা ভাঙচুর করে প্রেসক্লাবের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অপরদিকে, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেকের বাসভবনে হামলাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টা পর্যন্ত প্রায় ঘণ্টা ব্যাপী এ সংঘর্ষ চলে। এ সময় উভয়পক্ষের ৩৫ জন আহত হয়। আহত ২৫ আন্দোলনকারীকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে অনেকেই গুলিবিদ্ধ। এর আগে বিকাল সাড়ে ৩টায় মেয়রের বাড়িতে আরেক দফা হামলা চালায় আন্দোলনকারীরা। ওই সময় বাড়ির সামনে একটি মোটর সাইকেল ও চেয়ার ভাঙচুর করে।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের খুলনা জেলার সদস্য সচিব সাজিদুল ইসলাম বাপ্পি বলেন, ৪ আগস্ট চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু হয়। ওইদিন আমরা সকাল ১০ টায় শিববাড়ি মোড়ে জড়ো হই। সেখানে প্রচুর পরিমাণ ছাত্র-জনতা যোগ দেয়। তিনি আরও বলেন, এদিন ঢাকার সমন্বয়করা ঘোষণা দেয় যে, হাসিনা পতনের একদফা দাবিতে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ ৬ তারিখের পরিবর্তে ৫ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। তখন আমাদের মনে আশা তৈরি হয় যে, আগামীকালই শেখ হাসিনার শেষ দিন। তখন আমরা চিন্তা করলাম যে ঢাকায় যাবো। কিন্তু ঢাকায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে-না, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ হচ্ছে। তখন অনেকইে খুলনার স্বার্থে খুলনাতেই আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে আমি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই।



