সম্পাদকীয়

জুলাইয়ে শিশুদের ওপর নৃশংসতার ক্ষত সারাতে হবে

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর দুই বছর কেটে গেলেও এখনো সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় দুই হাজার শিশু। কারো কপালে জুটেছে স্থায়ী পঙ্গুত্ব, কারো শরীরে এখনো গুলি রয়ে গেছে, কেউ বা অন্ধ হয়ে গেছে, আবার কোনো কোনো শিশু সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ভুলতে না পেরে ট্রমায় ভুগছে। এ ধরনের অসহনীয় বেদনার ভার বইতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। গতকাল কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। জুলাই আন্দোলনে শিশুদের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তা অবর্ণনীয়। যে শিশু আন্দোলনে যায়নি, তাকেও জীবন দিতে হয়েছে। চার বছরের আবদুল আহাদ নিজের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। পরদিন হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। বাসিত খান মুসা বাবার সঙ্গে আইসক্রিম কিনতে বের হয়েছিল। একটি গুলি তার মাথা ভেদ করে যায়। এখন তার শরীরের ডান পাশ অবশ, সে কথা বলতে পারে না, নাকের নল দিয়ে তাকে খাবার গ্রহণ করতে হয়। গোলাপ হোসেনের মাথায় এখনো আটটি বুলেট রয়ে গেছে। চিকিৎসকরা তা বের করতে পারেননি। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে তাকে জীবিকার জন্য কাজ করতে হচ্ছে। আট বছরের নিশাদ আহমেদ সাগর এখনো দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে চিৎকার করে ওঠে। এমন দুঃসহ উদাহরণ একটি-দুটি নয়, অনেক। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানে ৮৪৩ জন শহীদ এবং ১৪ হাজার ৩৭০ জন আহত হয়েছেন। তবে এর মধ্যে কতজন শিশু, এর সঠিক হিসাব নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএসের সরকারি তালিকা থেকে শহীদদের ৮৩১ জন এবং ১১ হাজার ৫৫২ জন আহতের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছে কালের কণ্ঠ। এর মধ্যে জন্ম সাল বিশ্লেষণ করে ১১ হাজার ৫২৪ জন আহত এবং ৮৩১ জন নিহতের বয়স জানার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ১৮ বছরের কম বয়সী আহত শিশু-কিশোরের সংখ্যা এক হাজার ৮৭৬। আর শহীদ হয়েছে ১২৮ শিশু। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার বলি হয়েছে তারা। তাদের প্রতি অবহেলা করার সুযোগ নেই। এদিকে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর বলেন, ‘প্রায় ছয় হাজার ৪০০ জনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও জীবিকার ব্যবস্থা করা গেছে মাত্র ১৫০টি পরিবারের। এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান। মানসিক ট্রমা মোকাবেলার ব্যবস্থাও আরো জোরদার করতে হবে।’ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসির মারুফ কালের কণ্ঠকে বলেন, শৈশবে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ও অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারে। বড় কোনো দুর্যোগ, বিপর্যয় বা আঘাতের শিকার শিশু পরবর্তী সময়ে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডারে (পিটিএসডি) আক্রান্ত হতে পারে।

আমরা মনে করি, মারাত্মক ক্ষত বয়ে বেড়ানো প্রতিটি শিশুর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য বিশেষায়িত ডে কেয়ার ও পুনর্বাসনকেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। এ ছাড়া আহত শিশুসন্তান নিয়ে যেসব পরিবার আর্থিক অনটনের মধ্যে রয়েছে, চিকিৎসা ব্যয়ে যেসব পরিবার নিঃস্ব হয়েছেÑতাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের কথা ভাবতে হবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান সরকার অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবেÑএটিই প্রত্যাশা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button