মিরাজ শেখ নিখোঁজ: আটকের অভিযোগ অস্বীকার কোস্ট গার্ডের : তুলে ধরল নানা তথ্য

স্টাফ রিপোর্টার ঃ বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনির ঘোল এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে বাহিনীটি। কোস্ট গার্ড বলছে, মিরাজ শেখকে তারা কখনো আটক বা হেফাজতে নেয়নি। অভিযোগ পাওয়ার পর পরিচালিত অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান, অপারেশনাল রেকর্ড, টহল কার্যক্রম ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের তথ্য পর্যালোচনায় তাকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ বা হেফাজতে নেওয়ার কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গতকাল মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) এ সব তথ্য তুলে ধরেন কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লে: কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন। তার দেওয়া তথ্যমতে, মিরাজ শেখ ১৯৯৬ সালের ৩ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার জয়মনির ঘোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয়ভাবে তিনি জেলে ও মোটরসাইকেল চালক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে বাহিনীটির দাবি, তিনি সুন্দরবনের বনদস্যু ছোট সুমন বাহিনীর অন্যতম লজিস্টিকস সরবরাহকারী ছিলেন এবং মাদকসেবন করতেন । এছাড়া তিনি অতীতেও দীর্ঘ সময় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে সুন্দরবন এলাকায় অবস্থান করতেন বলেও দাবি করা হয়েছে। কোস্ট গার্ড আরও দাবি করেছে, বনদস্যু ছোট সুমন বাহিনীর অভিযোগ অনুযায়ী জেলেদের কাছ থেকে মুক্তিপণ ও চাঁদাবাবদ আদায় করা প্রায় ৬ লাখ টাকা নিজের কাছে রেখে দেওয়াকে কেন্দ্র করে বাহিনীটির সঙ্গে মিরাজ শেখের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। বাহিনীটির তথ্য অনুযায়ী, মিরাজ শেখের বাবা মোস্তফা শেখ একসময় সুন্দরবনের জুলফিকার বাহিনীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং ২০১৬ সালের ৩১ মে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এছাড়া মিরাজ শেখের বিরুদ্ধে বর্তমানে তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার মধ্যে দুটি মামলায় তিনি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি বলে দাবি করা হয়েছে। তার কয়েকজন আত্মীয়ের বিরুদ্ধেও ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও চুরির মামলা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে কোস্ট গার্ড।
মিরাজ শেখকে কোস্ট গার্ড তুলে নিয়ে গেছেÑপরিবারের এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে বাহিনীটি জানায়, ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জয়মনির ঘোল এলাকায় তাদের কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। ওই দিন কেবল হারবারিয়া ইকোট্যুরিজম এলাকায় নিয়মিত টহল পরিচালিত হয়েছিল। এছাড়া ১০ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়ার দাবি করা হলেও ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে কোস্ট গার্ড বা অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ উল্লেখ ছিল না বলেও দাবি করেছে বাহিনীটি। কোস্ট গার্ডের ভাষ্য, পরবর্তীতে ৮ মে ও ২৬ মে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ঘটনাস্থল, পরিচয়, পোশাক এবং ঘটনার বর্ণনায় একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে বাহিনীটি আরও দাবি করেছে, তারা কখনো কোস্ট গার্ডকে সাদা পোশাকে অভিযান পরিচালনা করতে দেখেননি এবং বাহিনীর বিরুদ্ধে আইনবহির্ভূত কর্মকা-ের কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও নেই।
এদিকে, ১১ জুন হারবারিয়া কোস্ট গার্ড স্টেশনের পন্টুনে হামলার ঘটনায় বনদস্যু ও তাদের সহযোগী, মিরাজ শেখের পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় কিছু ব্যক্তিকে দায়ী করেছে কোস্ট গার্ড। বাহিনীটির দাবি, হামলায় সরকারি সম্পদের প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সুন্দরবনের নিরাপত্তা কার্যক্রম তুলে ধরে কোস্ট গার্ড জানায়, “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” ও “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড”-এর মাধ্যমে ৪৫ জন বনদস্যুকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটক এবং বনদস্যুদের জিম্মিদশা থেকে ৪২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ধারাবাহিক অভিযানের ফলে ছোট সুমন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর কিছু সদস্য এবং ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যসহ ৩৭ জন বনদস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন বলেও দাবি করেছে বাহিনীটি। কোস্ট গার্ডের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ও কয়েকজন ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাহিনীটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করছে। তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের অভিযোগ এবং কোস্ট গার্ডের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। বিষয়টির প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছে স্থানীয়রা।



