স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় নানা জটিলতার মুখে শহররক্ষা বাঁধ প্রকল্প

# প্রকল্প ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় ৫ কোটি, কেএফডব্লিউ ও কেসিসির যৌথ বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
# এনএসবি প্রক্রিয়ার দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন চেয়ে চিঠি মন্ত্রানালয়ে প্রেরণ
# দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন মিললে শীঘ্রই আহ্বানের করা হবে দরপত্রের

মো. আশিকুর রহমান : দাতা সংস্থা জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের যৌথ অর্থায়ণে প্রায় ৪৯১ কোটির টাকায় খুলনায় জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় শহর এলাকার উন্নয়ন (ফেজ- ২) প্রকল্পটি বাস্তবায়ণের জন্য নানা মুখি কর্মযজ্ঞ চলছে। ওই প্রকল্পের অর্ন্তভুক্ত ২৬ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকা ব্যয়ের ৭৭৫ মিটারের শহররক্ষা বাঁধ নির্মান কাজটি নানা জটিলতার মুখে পড়ে বাস্তবে আলোর মুখ হারাতে বসেছে। নানা জটিলতার মুখে পড়া প্রকল্পের কাজটির বাস্তবায়ণে অগ্রগতি না ফেরায় ভৈরব নদে বিলীন হওয়ায় বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীদের মাঝে আরও নতুন করে নদী ভাঙনের আতঙ্ক শুরু হয়েছে, একই সাথে শহররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ণ নিয়েও তারা ভীষণ শঙ্কিতভাবে শঙ্কিত। ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীরা কেসিসির প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়েছেন-‘কবে বাস্তবায়ণ ও দৃশ্যমান হবে শহররক্ষা বাঁধ, আর কত অপেক্ষা করতে হবে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীদের। পূর্বের ন্যায় ভৈরব নদে তাদের প্রতিষ্ঠান বিলীন হওয়ার পরে কি ঘুম ভাঙবে কেসিসির? দ্রুত সময়ের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই প্রকল্পের বাস্তব বাস্তবায়নের জোরালো দাবি তোলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (কেএফডব্লিউ), জিওবি, ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের যৌথ অর্থায়ণে ৪৯১ কোটির টাকার খুলনায় জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় শহর এলাকার উন্নয়ন (ফেজ-২) প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা গত, ২০১৯ সালে শুরু হয়। পরে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের পর তা বাস্তবায়ণের লক্ষ্য শুরু হয় নানা কর্মযজ্ঞ। ওই ধারাবাহিকতায় প্রজেক্ট প্রকল্প প্রস্তাবের আলোকে গত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আর্ন্তজাতিক দরপত্র (আইএনবি) আহ্বান করেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। ওই দরপত্র আহ্বানে অংশ গ্রহন করেন আমিন এ- কোং, এম এম বিল্ডার্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, ডেজ্র বাংলা, আজাদ এ- ডন জেভি, মজুমদার এন্টার প্রাইজ ও এন এন বিল্ডার্স নামের ছয়টি প্রতিষ্ঠান। শর্তানুসারে আর্ন্তজাতিক দরপত্র (আইএনবি) আহ্বানে অংশগ্রহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলির ঠিকাদারবৃন্দ আহ্বানের যোগ্যতা ও মানের না হওয়ার দরুন, আর্ন্তজাতিক দরপত্রের আহ্বানের বাইরে গিয়ে জাতীয় দরপত্র আহ্বান (এনসিবি)’র বিষয়টি নিয়ে দাতা সংস্থা জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (কেএফডব্লিউ) ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন প্রকল্প কর্মকর্তাদের মাঝে একাধীক ভাচুয়ালী বৈঠক চলে। সর্বশেষ, গত ৯ জুলাই উভয়ের চলমান সভায় দাতা সংস্থা জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (কেএফডব্লিউ) সিধান্ত জানায়, প্রকল্প প্রস্তাবণায় আর্ন্তজাতিক (আইএনবি) দরপত্র আহ্বানের শর্তবলী থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়ণে জাতীয় দরপত্র আহ্বান (এনসিবি)’র করা যাবে। ওই সিদ্ধান্তনুসারে প্রকল্প সংশ্লিস্টরা জাতীয় দরপত্র আহ্বান (এনসিবির) মাধ্যমে দরপত্র আহ্বানের সাময়িক অনুমোদনের ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রানালয়ে গত ২২ জুলাই পত্র প্রেরণ করেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। মন্ত্রালয়ের সাময়িক অনুমোদন মিলবার পরই জাতীয় দরপত্র আহ্বান (আইএনবি) আওতায় কেএফডব্লিউ ও খুলনা কেসিসির অর্থায়ণে ৪৯১ কোটির টাকা ব্যয়ের খুলনায় জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় শহর এলাকার উন্নয়ন (ফেজ-২) প্রকল্পের দরপত্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে বলে বলে জানা গেছে।
দৌলতপুর ভৈরব নদী সংলগ্ন বাজার এলাকার ব্যবসায়ী উজ্জ্বল জানান, দোকানটি নদীতে ভেঙে পড়া মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এর আগেও শত শত দোকানপাট, ব্যবাসায়ী প্রতিষ্ঠান নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেই করোনা মহামারির সময় হতে শুনছি নদী ভাঙনের হাত ক্ষেতে বাজারকে বাজারে রক্ষাকারী বাঁধ নির্মাণ করবে কেসিসি। শুধু আশ্বাস, প্রশ্বাস মিলছে, বাস্তবায়ণ হবে কবে, কবে থেকে আমরা এর সুফল ভোগ করবো।
দৌলতপুর বাজার বণিক সমিতির সিনিয়র সহ-সাধারন সম্পাদক শেখ পলাশ হোসেন জানান, আমরা বাজারের ব্যবসায়ীদের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখভাল করাই আমাদের প্রধান ও মূল কাজ। কেসিসি দৌলতপুর বাজারকে নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার জন্য শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহন করেছে, যা শুরু হয় ২০২১ সাল থেকে। ৬টি বছর গত হয়ে গেলেও দেখা মিলছেনা প্রকল্প বাস্তবায়ণের। ব্যবসায়ীরা আমাকে প্রশ্ন করে কবে দৃশ্যমান হবে শহররক্ষা বাঁধ প্রকল্পের বাস্তবায়ণ? দ্রুত সময়ের মধ্যে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ণে করে নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীদের রক্ষা করতে কেসিসির প্রতি অনুরোধ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজনের) খুলনা জেলা সভাপতি এডভোকেট কুদরত-ই খুদা জানান, জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় খুলনা শহর এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পটির বাস্তবায়নের কার্যক্রম দীর্ঘদিন যাবৎ। যতটুকু শুনেছে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কেসিসিকে নানামুখি জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। তথাপী, প্রকল্পটি বাস্তবায়ণ হলে এটি জলাবায়ূর উপর গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে। খুলনা আরে ধাপ উন্নয়ণে এগিয়ে যাবে। খুলনার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, শহররক্ষা বাঁধের মাধ্যমে দৌলতপুর বাজারকে রক্ষাকরণসহ সার্বিক উন্নয়ণে খুলনা আগামী একটি সুন্দর শহর ও পরিচ্ছন্ন শহর হিসাবে গড়ে উঠবে বলে আমি মনে করি।
এ বিষয়ে খুলনা সিটি কর্পোরশেন পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক আবির-উল জব্বার নানা, দাতা সংস্থা জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (কেএফডব্লিউ) ও কেসিসি’র যৌথ অর্থায়ণে জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় শহর এলাকার উন্নয়ন ( ফেজ- ২) প্রকল্পের বাস্তবায়ণে নানামুখি কার্যক্রম চলছে। গত, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আর্ন্তজাতিক দরপত্র (আইএনবি) আহ্বান করা হয়, কিন্তু ওই দরপত্র যারা অংশগ্রহন করা তাদের প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখিত যোগ্যতা ও মানের না হওয়ার দরুন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে দাতা সংস্থা ও আমাদের একাধীক ভার্চুয়ারী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ, গত ৯ জুলাই উভয়ের চলমান সভায় দাতা সংস্থা জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (কেএফডব্লিউ) সিধান্ত জানায়, প্রকল্প প্রস্তাবণায় আর্ন্তজাতিক (আইএনবি) দরপত্র আহ্বানের শর্তবলী থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়ণে জাতীয় দরপত্র আহ্বান (এনসিবি)’র করা যাবে। ওই সিধান্তনুসারে প্রকল্প স্থানীয় সরকার মন্ত্রানালয়ে গত ২২ জুলাই পত্র প্রেরণ করা হয়। মন্ত্রালয়েল সাময়িক অনুমোদন পেলে জাতীয় দরপত্র আহ্বান (আইএনবি) প্রকল্পের দরপত্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, প্রায় ৫ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয়ের ৩৬% শতাংশ (১’শ ৭৮ কোটি ৪৬ হাজার টাকা) সরকার (জিওবি), ৬৩% শতাংশ (৩’শ ১২ কোটি ২৮ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা) জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (কেএফডব্লিউ) এবং ১ কোটি টাকা কেসিসি’র নিজস্ব তহবিল হতে ব্যয় করা হবে। ওই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৮০০ মিটার সোনাডাঙ্গা বাইপাস সড়কের উন্নয়ন, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি টাকা, ১৪,৭৪৫.৫৫ মিটার ড্রেনেজ সিস্টেম আপগ্রেডিংয়ে নবীনগর, সোনাডাঙ্গা, বাস্তহারা সাব-ক্যাচমেন্ট এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯০ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকা ৪,৮১৫ মিটার। খাল আপগ্রেডিংয়ে নিরালা খাল, বাস্তহারা খাল, দেয়ানা চৌধুরী খাল, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকা, ২৫০০ বর্গমিটার রুপসা রিভারফ্রন্ট উন্নয়ণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকা, ৭৭৫ মিটার শহর রক্ষাকারী বাধা নির্মান (দৌলতপুর বাজার হতে মহেশ্বরপাশা শশ্মান ঘাট) পর্যন্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৬ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকা, আলু তলা আউটলেট গেট আপগ্রেডিং ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা, লবণচরা পাম্পিং স্টেশন ও আউটলেট গেট নির্মাণে ৭৪ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা, ভূমি অধিগ্রহন/ক্রয় (পাম্প হাউজ নিমার্ণ, খাল প্রশস্তকরণ ও রিভারফ্রন্ট উন্নয়ন), পূনর্বাসন ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৯৮ লক্ষ টাকা। আশা করা যাচ্ছে প্রকল্পটি বাস্তবায়ণ হলে জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় খুলনা শহর এলাকার গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খুলনা আগের ধাপ উন্নয়ণের মুখ দেখবে। বিশেষ করে বহু বছরের ঐতিহাসিক দৌলতপুর বাজার ভৈরবের ভাঙনের হাত হতে রক্ষা, সবমিলিয়ে এই প্রকল্পটি খুলনার জলাবদ্ধা দূরকরণ,পরিবেশ সংরক্ষন, শহররক্ষা বাধের মাধ্যমে দৌলতপুর বাজারকে রক্ষাকরণসহ সার্বিক উন্নয়ণে খুলনা আগামী একটি সুন্দর শহর হিসাবে গড়ে উঠবে বলে আশাকরা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button