জীবনের মূল্য কোথায়

# সীতাকু-ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু #
চট্টগ্রামের সীতাকু-ে একটি জাহাজ ভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। প্রতিদিনের মতো গত শুক্রবারও শ্রমিকরা কাজে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরেছেন লাশ হয়ে। বলা হয়েছে, বিষাক্ত গ্যাসের কারণে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। সংগত কারণে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ওই কারখানার শ্রমিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সামনে আসে। ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং নামের কারখানায় শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, কারখানার ভেতর থেকে চিৎকার শুনে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অসুস্থ কয়েকজনকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে, আর কয়েকজনের মরদেহ পড়ে রয়েছে। এতে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়। জানা গেছে, জাহাজের তলায় থাকা একটি এলএনজি ট্যাংক কাটার কাজ চলছিল। সেখানে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিস ও চট্টগ্রাম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ধারণা, বিষাক্ত গ্যাসের কারণে শ্রমিকদের মৃত্যু হতে পারে। আমাদের দেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এটিই প্রথম নয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৩ জন মারা যান ২০১৯ সালে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আরো ২৮টি দুর্ঘটনায় তিনজন শ্রমিক মারা যান এবং আহত হন ২৫ জন। আর এই ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু যোগ করলে ২০১৫ সালের শুরু থেকে চলতি আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় কমপক্ষে ১৪৯। শুধু তা-ই নয়, এই ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে আগেও নিরাপত্তাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তার ঘাটতি, ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয় না, ওভারটাইমের টাকাও ঠিকমতো পান না শ্রমিকরা। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত জুলাই মাসে শ্রম আদালতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বিশ্লেষকমহল দীর্ঘদিন থেকে বলে আসছে, এ ধরনের ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং দিনের পর দিন অবহেলা-উদাসীনতা এবং কাঠামোগত ত্রুটির কারণেই শ্রমিকদের জীবন দিতে হয়। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে বলেছেন, হতাহতদের পরিবারের পাশে থাকবে সরকার। মন্ত্রী জানান, সরকারের তরফ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে মালিকপক্ষের কোনো গাফিলতি পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া জাহাজ ভাঙা শিল্পের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের পৃথক আরেকটি কমিটি গঠন করেছে। মালিকপক্ষ নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আর্থিক ক্ষতি পূরণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সম্মানজনক ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দিলেই সব হিসাব চুকে যায় না। যে পরিবার মানুষকে হারাল, তাকে কী দিয়ে সান্ত¡না দেওয়া যায়? এ কারণে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা কাঠামোগত ত্রুটি আগে সারাতে হবে। আমরা মনে করি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য জানা প্রয়োজন এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায় এড়ানোর কৌশল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আগামী দিনে জাহাজ ভাঙা শিল্পটি শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠুকÑএটিই কাম্য।
