নকল হীরায় বাজার সয়লাব : দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন

দেশে হীরার খনি নেই, উৎপাদনও নেই। বেশ কয়েক বছর থেকে বৈধ পথে হীরা আমদানিও বন্ধ, অথচ দেশের বাজারে নামি-দামিসহ শত শত প্রতিষ্ঠান দেদারসে হীরার গয়না বিক্রি করছে। বলা হচ্ছে, এসবের বেশির ভাগই নকল, নয়তো চোরাপথে আনা হয়েছে। ফলে একদিকে ক্রেতাসাধারণ যেমন প্রতারিত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ ব্যবসায়ীরা ফুলেফেঁপে উঠলেও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের দুর্দিন কাটছে না। এমন উদ্বেগের চিত্রই উঠে এসেছে দেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকার প্রতিবেদনে। খবরে বলা হয়েছে, ২০১৮ সাল থেকেই বৈধ আমদানি প্রায় বন্ধ। ২০২৫-২৬ সালে হীরা আমদানির পরিমাণ ছিল শূন্যের কোঠায়। কিন্তু বর্তমানে দেশে হীরার গয়নার বাজার প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি। সংগত কারণেই প্রশ্ন আসে, দেশে এত হীরা এলো কোথা থেকে? কালের কণ্ঠের অনুসন্ধান ও ওয়াকিফহাল মহলের তথ্য বলছে, দেশে হীরা বাজারের বড় অংশই চোরাচালানের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া ল্যাবে তৈরির নকল হীরায় গড়া গয়নার বাজারও রমরমা। যেখানে ০.২ গ্রাম হীরার দাম প্রায় ৮৩ হাজার টাকা, সেখানে দেশের দোকানগুলোতে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকায় হীরার গয়না বিক্রির বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এতে সহজেই অনুমেয়, এসব গয়না কেমন হীরায় তৈরি। ছোটখাটো প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বড় কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও। তাদের দৈনিক লেনদেনও কোটি টাকার কাছাকাছি, অথচ বৈধ আমদানির পর্যাপ্ত তথ্য নেই। বৈধভাবে এলসি দিয়ে মাত্র ৩৮.৪৭ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করা হয়েছে (২০০৬-২০২৪), কিন্তু স্থানীয় বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি টাকার সোনা-হীরা সংগ্রহের কোনো বৈধ নথি নেই। সিআইডি ২০২৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মামলাও করেছে। রয়েছে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগও। এদিকে গত ২ এপ্রিল পাচারকালে যশোরে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকার হীরাসহ তামিলনাড়–র এক নাগরিককে আটক করা হয়। এর আগে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে ভারত থেকে আসা প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের হীরার গয়নাসহ বাংলাদেশি হাফিজুর রহমানকে আটক করে বিজিবির একটি টহলদল। শুধু এই দুই ঘটনাই নয়, প্রতিনিয়তই ঘটছে অবৈধ পথে হীরা চোরাচালানের ঘটনা, যার বেশির ভাগই অধরাই থাকছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। হীরা আমদানি-রপ্তানিতে আমাদেরও সুদিন ছিল। ২০০৭ সালে সাভারের ব্রিলিয়ান্ট হীরা লিমিটেড বেলজিয়ামে প্রথম মসৃণ হীরা রপ্তানি করে। এরপর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এতে যোগ দেয়। সেই সময় প্রায় প্রতি সপ্তাহে উড়োজাহাজে হীরার চালান উঠত। রপ্তানি আয় ছিল প্রায় তিন কোটি ৯৬ লাখ ডলার। অথচ ২০১৯ সাল থেকে এই খাতে রহস্যময় অন্ধকার নেমে আসে। এদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সামনের দিনে এই খাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বে মসৃণ হীরা রপ্তানির বাজার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের, যার বড় অংশই ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বাংলাদেশেও সোনার দক্ষ কারিগর রয়েছেন, সোনা আমদানির জট আগেই খুলেছে। এখন অমসৃণ হীরায় কর কমানো, বন্ড সুবিধা সহজ করা হলে এবং রপ্তানিতে প্রণোদনা বাড়ালে খাতটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। দেশে এখন ছোট আকারের কাটিং-পলিশিং কারখানা সীমিত। আমরা মনে করি, এই খাতের ভিত্তি মজবুত করতে নীতি সহায়তা প্রয়োজন। চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি যেসব ব্যবসায়ী নকল হীরা বিক্রি করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ক্রেতাসাধারণেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।
