সাগর-মেঘনায় ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ : কমেনি দাম

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ সাগরে ও মেঘনা নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। বৃহস্পতিবার বিকালে কাক্সিক্ষত রূপালি ইলিশ ধরা পড়ায় হাসি ফুটেছে মেঘনাবেষ্টিত এলাকার জেলে, আড়তদার ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে। তবে এর প্রভাব এখনো রায়পুরসহ পার্শ্ববর্তী বাজারগুলোয় এসে পড়েনি। বাজারগুলোতে ইলিশের বেশ সরবরাহ থাকলেও দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালে আসেনি। বিক্রেতারা বলছেন, বাড়তি চাহিদার কারণেই লক্ষ্মীপুরের বাজারে দাম কমতে আরও কিছু সময় লাগবে। রায়পুর, সদর ও চরভৈরবির ইলিশ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ায় উপকূলীয় সদরের মজুচৌধুরীর ঘাট ও রায়পুরের উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী ইউপির বিভিন্ন এলাকার জেলেপল্লি ও আড়তগুলোতে আনন্দের জোয়ার বইছে। গত এক মাস মেঘনা নদীর নব্যতার কারণে জেলেরা ট্রলার, বোট নিয়ে সাগরে গেলেও প্রথম দিকে জালে তেমন একটা ধরা পড়েনি ইলিশ। পরে অবশ্য দৃশ্যপট বদলায়। গত কয়েক দিন জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে। ইলিশের মোকাম খ্যাত মজুচৌধুরীঘাট, মতিরহাট, রায়পুর ও সীমান্তবর্তী চরভৈরবির ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। রায়পুর সীমান্তবর্তী চরভৈরবি ও হাইমচরসহ বাজারও এখন ইলিশের বেচাকেনায় বেশ গরম। ইলিশ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ বছর বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় নদীতে পানি প্রবাহ বেড়েছে। আর এজন্যই ইলিশ আগের চেয়ে বেশি ধরা পড়ছে। এছাড়া সামুদ্রিক নিম্নচাপ এবং সাইক্লোনের প্রভাবেও বেড়েছে ইলিশের উৎপাদন। দেশের নদীর পানির গুণাগুণ ও প্রবাহ ইলিশের জন্য এখনো অনুকূলে। এ কারণে ডিমওয়ালা মা ইলিশ সাগর থেকে স্রোতযুক্ত মিঠাপানির নদীতে ডিম ছাড়তে আসে। এছাড়াও ইলিশ মাছের প্রজনন নিরাপদ রাখতে গত কয়েক বছর দেশব্যাপী ইলিশ আহরণ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বন্ধ রাখছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ফলে কমেছে জাটকা, বেড়েছে ইলিশের পরিমাণ। ইলিশ সাধারণত জুলাই মাসের শেষদিকে সমুদ্র থেকে নদীতে আসতে শুরু করে। পদ্মা ও মেঘনা নদীর পানির স্তর ও গভীরতা অন্য নদীর চাইতে বেশি হওয়ায় ইলিশ পদ্মার দিকেই আসে। এ কারণে মেঘনার আশপাশের সাগর এলাকায় বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- রায়পুর, রামগতি, কমলনগর ও মজুচৌধুরীঘাটসহ সীমান্তবর্তী চরভৈরবি আড়তগুলোয় এখন শ্রমিকরা ট্রলার থেকে ইলিশ নামানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ঝুড়িতে করে শ্রমিকেরা ইলিশ এনে আড়তে ফেলছেন। একদিকে মাপামাপির কাজ, অন্যদিকে চলে দরদাম। পাইকারি ক্রেতারা সেসব আড়ত থেকে ইলিশ রাজধানীর বাজারগুলোয় নিয়ে যান। এ কারণে জেলার সব মাছের আড়তে এখন ইলিশের ছড়াছড়ি। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সাধারণত ইলিশের দাম নির্ভর করে সাইজের উপরে। এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশের দাম এবং এক কেজির কম ওজনের সাইজের ইলিশের দাম কখনই এক হবে না। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ চার উপজেলার বাজারে সাড়ে ৩শ টাকা কেজি দরের ইলিশও পাওয়া যায়, যেখানে ২শ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিতে ৫টি। আবার এক কেজি ওজনের বা তার বেশি ওজনের সাইজের ১টি ইলিশ কিনতে হলে গুনতে হবে কমপক্ষে ১ হাজার ২শ টাকা। আড়তগুলোয় প্রতি কেজি ইলিশ সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে তা খুচরা বাজারে এসে সেটা ১ হাজার ২শ টাকা হচ্ছে। এছাড়া এলাকাভেদে এ দাম আরও বেশি। রায়পুরে হজিমারা স্লুইসগেট এলাকার ইলিশ আড়তদার দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, এবারের ধরা পড়া ইলিশের আকার বেশ বড়। তবে ছোট আকারের ইলিশও আছে। তবে তা পরিমাণে কম। তিনি বলেন, সামনে আরও বেশি ইলিশ ধরা পড়বে। কারণ এখনই ইলিশ ধরার প্রকৃত মৌসুম। তাই দাম আরও কিছুটা কমবে বলেও ধারনা করছেন তিনি। সাজু মোল্লারঘাটের আড়তদার শাহ আলম জানিয়েছেন, মাঝারি সাইজের ইলিশের চাহিদা বেশি। কারণ, মধ্যবিত্তরা এই সাইজের ইলিশই কিনতে চান। খুচরা বাজারে ৫০০ গ্রাম থেকে সাড়ে ৭শ গ্রাম ওজনের এক কেজি ইলিশের দাম ৬শ টাকা। বড় ইলিশের চাহিদা বেশি হলেও তা সবার পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। তাই মোকামগুলোতে মাঝারি সাইজের ইলিশের চাহিদা ব্যাপক বলে জানান শাহ আলম। জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাগরে ও নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার পরও তেমন মাছ না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন জেলেরা। তবে এখন প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে এবং আকারেও বড়। তাই জেলেরা বেশ খুশি। অন্য বছরগুলোয় আড়তে রপ্তানিকারকরা আসেন বড় সাইজের ইলিশের অর্ডার দিতে। এ বছর এখনো আসেননি। এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, নদীতে পানির প্রবাহ বেড়েছে বলে জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। তাই বাজারেও প্রচুর ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। আর আকারেও বেশ বড়। দাম এখন কিছুটা বেশি হলেও ভবিষ্যতে কমবে বলে মনে করেন তিনি। হায়দরগঞ্জ বাজার এলাকার মাছ ব্যবসায়ী ইউসুফ হোসেন জানিয়েছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে। আড়তেও প্রচুর মাছ বেচাকেনা হচ্ছে। এভাবে মাছ ধরা পড়লে জেলেরা লাভের মুখ দেখবেন। এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কার্যকর পদক্ষেপ ও পরিকল্পনায় (প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা, জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের ভিজিএফ/পুনর্বাসন) বিশেষ করে নৌবাহিনী, কোস্টকার্ড, পুলিশ, প্রশাসন ও জনগণের সহযোগিতায় দেশে ব্যাপকহারে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে। এ বছর আশা করা হচ্ছে ৬ লাখ টনের কাছাকাছি ইলিশ উৎপাদন হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইলিশের অবদান অনেক। জিডিপিতে ইলিশের অবদান এক-শতাংশ বলেও জানান তারা।



