ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যে বাড়ছে : কঠোর পদক্ষেপ চাই

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ছিনতাইয়ের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে স্কুল শিক্ষিকা রনজিলা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনা নাগরিক সমাজকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছে। এই শিক্ষিকা ঢাকায় এসেছিলেন চিকিৎসা করাতে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীদের হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় মারাত্মক আঘাত পান তিনি। এর পরই মৃত্যু। গত শুক্রবারের ঘটনা এটি। একই দিন ভোরে কদমতলীর ভাঙা ব্রিজের পাশে ছিনতাইয়ের সময় পথচারীদের সঙ্গে জাপটাজাপটির সময় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এক ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আরেক ছিনতাইকারী নিহত হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ভাটারা এলাকায় এক নারীর ব্যাগ ও মোবাইল ফোন ছিনতাই হয়। গণমাধ্যমের খবর বলছে, শুধু রাজধানীতেই নয়, সারা দেশেই চুরি-ছিনতাই আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। পুলিশের বরাত দিয়ে কয়েকটি পত্র পত্রিকা জানিয়েছে, রাজধানীর মূল ৩০৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় চিহ্নিত ছিনতাইকারীর সংখ্যা এক হাজার ৩৮৭। এই হিসাব প্রায় তিন মাস আগের। গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ। সক্রিয় ছিনতাইকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০৮ জন রয়েছে ওয়ারী বিভাগে। তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন করে। এ ছাড়া মতিঝিলে ১৬৮, লালবাগে ১৫৯, রমনায় ১৫২, গুলশানে ৬৭ এবং মিরপুরে ৫৩ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী রয়েছে। হতাশাজনক তথ্য হলো, তাদের ৮০ শতাংশের বেশি একাধিক মামলার আসামি এবং গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বের হয়ে এসে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছিনতাইকারীদের মধ্যে অনেকেই ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্ত রয়েছে, যারা সুযোগ পেলেই ছুরি-চাপাতি নিয়ে রাস্তায় নামছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এখন ছিনতাইয়ের সঙ্গে সহিংসতাও বাড়ছে। ছিনতাইয়ে বাধা দিলেই নেমে আসছে ধারালো অস্ত্র। খবরে আরো বলা হয়েছে, রাজধানীতে দুই শতাধিক ছিনতাইপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন সামনে আসে, ছিনতাইকারীরাও চিহ্নিত এবং হটস্পটগুলোও জানা; বলা হচ্ছে, নিয়মিত অভিযানও চলছেÑতার পরও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য বাড়ে কিভাবে? জানা গেছে, শিক্ষিকা রনজিলা পারভিনের মৃত্যুর পর বিশেষ নজরদারি ও অভিযানে গুরুত্ব দিয়েছে ডিএমপি। এ ঘটনায় জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৫০টি থানা এলাকায়ই টহল টিম বাড়ানোসহ বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি কথা না বললেই নয়, আমাদের এখানে কোনো ঘটনা আলোচনায় আসার পর দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। আর যেসব ঘটনা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই, সেগুলো প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের হিসাব বলছে, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৭৮টি। ধারণা করা হয়, এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ভুক্তভোগী অনেকেই আইনের দ্বারস্থ হচ্ছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘মামলা দায়ের থেকে শুরু করে জামিন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করা না গেলে ছিনতাইকারীদের লাগাম টানা সম্ভব হবে না।’ আমরাও মনে করি, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। অপরাধীরা যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগীদের থানায় অভিযোগ করতে মামলার প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার। একই সঙ্গে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধিও অপরিহার্য।
