স্থানীয় সংবাদ

বৃষ্টিতে ছাদ চুইয়ে পানি, দেয়ালে ফাটল, চরম ঝুঁকির মধ্যে সরকারি কোয়ার্টার : সংস্কারের উদ্যোগ নেই

অবহেলিত একটি জনপদের নাম কয়রা-(১০)

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা)ঃ খুলনার কয়রা উপজেলা পরিষদের সরকারি আবাসিক ভবনগুলোর বেহাল দশা। প্রায় পাঁচ দশক আগে নির্মিত এসব ভবন এখন জরাজীর্ণ ও বসবাসের অনুপযোগী। কোথাও দেয়ালে ফাটল, কোথাও ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। বেরিয়ে পড়েছে মরিচা ধরা রড। ছাদ চুইয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে ঘরের ভেতর। ভবনজুড়ে জন্মেছে আগাছা-পরগাছা। হালকা বাতাসেও কেঁপে ওঠে জরাজীর্ণ ভবনগুলো। যেকোনো সময় এসব ভবন ধসে পড়ে প্রাণহানিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কার মধ্যেই আবাসন সংকটের কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবার নিয়ে এসব ভবনে বসবাস করছেন। অথচ জেলা প্রশাসন প্রায় তিন বছর আগেই ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সেখানে বসবাস না করার জন্য নোটিশ দিয়েছিল। এরপরও এখন পর্যন্ত ভবনগুলো পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উপজেলা প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্য ছয়টি আবাসিক ভবন এবং উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনওর জন্য পৃথক দুটি বাংলো নির্মাণ করা হয়। এছাড়া কর্মচারীদের থাকার জন্য রয়েছে একটি ডরমিটরি ভবন। সুন্দরবন-সংলগ্ন কয়রা উপজেলার প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্েযর সঙ্গে মিল রেখে আবাসিক ভবনগুলোর নাম দেওয়া হয়Ñসুন্দরী, গেওয়া, বাইন, কাঁকড়া, গরান ও ধুন্দল। দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে ভবনগুলোর অধিকাংশই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দুটি ভবন সম্পূর্ণ খালি পড়ে থাকায় সেখানে আগাছা ও পরগাছা জন্মেছে। বাকি চারটি ভবনে দুই একজন করে কর্মকর্তা-কর্মচারী ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি ভবনের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে রড বেরিয়ে গেছে এবং তাতে মরিচা ধরেছে। মেঝে ও সিঁড়ির অবস্থাও নাজুক। অধিকাংশ জানালা-দরজা ভাঙাচোরা। বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। পানি পড়া ঠেকাতে অনেক বাসিন্দাকে ছাদে পলিথিন টানিয়ে রাখতে দেখা গেছে। বাথরুমগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক ও ব্যবহারের অনুপযোগী। ভবনে বসবাসরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী বলেন, “বরান্দাসহ বিভিন্ন কক্ষের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখানে বসবাস করতে হচ্ছে। বাথরুমগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী। কর্মচারীরা স্বল্প বেতনে দূর-দুরান্ত থেকে এসে চাকরি করেন। ডরমিটরিও দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হচ্ছে। আবাসন সংকটের কারণে অনেক কর্মকর্তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে অফিসে যাতায়াতেও নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। কেউ কেউ আবাসন সংকটের কারণে কয়রা থেকে বদলি হওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার নতুন কর্মকর্তাদের অনেকে যোগদানের আগেই বদলির তদবির শুরু করেন বলে জানা গেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ জাবের বলেন, “সরকারি কোয়ার্টারে থাকার মতো অবস্থা নেই। বর্তমানে অফিস থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছি। এতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “আবাসন সংকটের কারণে পাশের উপজেলায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হচ্ছে। সেখান থেকে কষ্ট করে নিয়মিত অফিস করতে হয়। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার ম-ল বলেন, “বাইরে বাসাভাড়া তুলনামূলক বেশি এবং অফিস থেকেও অনেক দূরে। তাই ঝুঁকি নিয়েই কোয়ার্টারে থাকতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে। সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, “কর্মকর্তাদের থাকার জন্য প্রতিটি ভবনই বর্তমানে প্রায় পরিত্যক্ত। নিরূপায় হয়েই কেউ কেউ সেখানে থাকছেন। বিষয়টি উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় একাধিকবার আলোচনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। সরকারি ভবন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় পাঁচ দশক আগে পুরনো প্রযুক্তিতে নির্মিত এসব ভবনে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবাসন সংকট নিরসনে সংস্কারের পাশাপাশি নতুন বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ চেয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, “ভবনগুলোর অবস্থা এতটাই খারাপ যে সেখানে বসবাসের মতো পরিবেশ নেই। ভবনগুলোকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও এখন পর্যন্ত নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিষয়টি অনেক আগেই উপজেলা পরিষদের রেজুলেশনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। ইতি মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। তবে একনও কোন ব্যবস্থা গ্রহনের সংবাদ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই উপজেলা পরিষদের সরকারি আবাসিক ভবনগুলোর দ্রুত সংস্কার অথবা নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন। কর্মকর্তাদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন তাদের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে কয়রায় সরকারি দপ্তরগুলোতে জনসেবা কার্যক্রমও আরও গতিশীল হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button