নারী থেকে পুরুষ হওয়ার স্বপ্ন!

স্তন অপারেশনের পর মৃত্যু
প্রবাহ রিপোর্ট : নারী থেকে পুরুষ হওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্তন অস্ত্রোপচার করার পর রোজি আক্তার লিজা (৩১) নামে এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত লিজা বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদারের মেয়ে।
ঢাকার পান্থপথের গ্রীন রোডে অবস্থিত ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে গত ৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে অস্ত্রোপচারের পরদিন রোববার ভোরে তার মৃত্যু হয়। ওই দিন বিকেলে পরিবারের সদস্যরা লিজার লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে তড়িঘড়ি করে সন্ধ্যার মধ্যেই তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।
এলাকাবাসী ও মৃতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রোজি আক্তার লিজা মেয়ে হলেও ছেলেদের মতো আচরণ করতেন এবং ছেলেদের মতো চুল কাটাতেন। তার বাড়িতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার নামের এক যুবতীর আনাগোনা ছিল। ওই যুবতীকে লিজা স্ত্রী হিসেবে মনে করতেন এবং জেনিফাও লিজাকে স্বামী হিসেবে দেখাশোনা করতেন।
সূত্রমতে, প্রায় তিন বছর আগে একই ধরনের সম্পর্কের কারণে লিজা বাড়ি থেকে চলে যান। পরবর্তীতে তারা পুনরায় ফিরে আসেন। এরপর জেনিফার সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিজার পরিচয় হয়। তারপর থেকে জেনিফা প্রায়ই লিজাদের বাড়িতে এসে মাসের পর মাস একসাথে বসবাস করতেন। বিষয়টি লিজার বাবা ও মা জানলেও জেনিফা কৌশলে তাদের আপন করে নেওয়ায় তারা নীরব ছিলেন।
জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার জানান, তারা একে অপরের বাসায় বেড়াতেন ও একসাথে থাকতেন। লিজা ঢাকায় হরমোনের চিকিৎসা করাতেন। লিজার মা, বাবা ও বোন স্তন অপারেশনের জন্য দেড় লাখ টাকা দিয়েছিলেন। ওই টাকা দিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার পান্থপথের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ‘সরফরাজ’ নাম দিয়ে লিজাকে ভর্তি করা হয়। সেখানে অপারেশনের পূর্বে সম্মতিপত্রে লিজার স্ত্রী হিসেবে জেনিফা স্বাক্ষর করেন। মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের স্ত্রী পরিচয়ে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরের বিষয়ে জেনিফা বলেন, লিজার মা ও বাবার সম্মতি নিয়েই স্বাক্ষর করা হয়েছে।
লিজার বাবা আব্দুর রব হাওলাদার বলেন, সে (জেনিফা) যে স্বাক্ষর করবে এবং তার স্বাক্ষরে যে অপারেশন হবে, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এমনকি লিজার নাম যে ‘সরফরাজ’ রাখা হয়েছে, তা আজই কেবল জেনেছি। তিনি আরও বলেন, লিজা অপারেশন করে পুরুষ হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করবে—এমনটা ওর মায়ের কাছে শুনেছি। ঘরের যেকোনো বিষয়ে আমার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। পরিবারের অন্য সদস্যরা আমাকে আলাদা চোখে দেখে।
লিজার মা ফজিলা বেগম বলেন, আমার মেয়ে লিজা ছোটবেলা থেকেই কোনো ছেলেকে পছন্দ করত না। তাকে জোর করে দুইবার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোনো সংসারই সে করেনি। ছেলেদের সাথে চলাফেরা বা ঘর-সংসার করার কোনো মানসিকতাই তার ছিল না।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জেনিফা আমাদের বাড়িতে এসে লিজার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে থাকত। যে কারণে লিজার অপারেশনের দায়িত্ব আমরা জেনিফার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। এ ধরনের কর্মকা- ইসলাম সমর্থন করে কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইসলাম সমর্থন করে না জানি, তবে এখন ইন্টারনেটে ও মোবাইলে এমন ঘটনা শত শত দেখা যায়।
এদিকে ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যুসনদে দেখা গেছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর লিজাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সনদপত্রে লিজার নাম ‘সরফরাজ’ এবং লিঙ্গ ‘পুরুষ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে মৃত্যুসনদপত্রে দেওয়া নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে লিমন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে অ্যাডমিন পরিচয় দেন এবং জিএম-এর সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালের জিএম বিশ্বজিৎ বৈদ্যের কাছে জানতে চাইলে তিনি দায় এড়িয়ে যে ডাক্তারের অধীনে রোগী ভর্তি হয়েছিল, তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে পরে ফোন করবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।


