স্থানীয় সংবাদ

খুমেক হাসপাতালের ক্যান্টিন চলছে কার ইশারায়?

ইজারা নেই, চুক্তিও অস্পষ্ট

স্টাফ রিপোর্টার ঃ ইজারা ছাড়াই চলছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্টিন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা কীভাবে ইজারা বা বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, কে বা কারা এর অনুমতি দিয়েছে তা নিয়েই উঠেছে নানা প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর প্রায় এক বছর ক্যান্টিনটি বন্ধ ছিল। পরে এটি আবার চালু হয়।
একাধিক সূত্রের দাবি, প্রথমে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ক্যান্টিনটি পরিচালনা শুরু করেন। পরবর্তীতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জাতীয়তাবাদী ইন্টার্ণ চিকিৎসকদের একটি চুক্তিনামার মাধ্যমে ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানা যায়। তবে কখন, কার সঙ্গে এবং কী প্রক্রিয়ায় এই চুক্তি বা হাত বদল হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ক্যান্টিনে গিয়ে কথা হয় কর্মী মারুফের সঙ্গে। তিনি জানান, ক্যান্টিনের ম্যানেজার হিসেবে ইন্টার্ন চিকিৎসক আরাফাত এবং পরিচালনার সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ইন্টার্ণ চিকিৎসক কামরানের সম্পৃক্ততার কথা। তবে ম্যানেজার আরাফাতের মোবাইল নম্বর চাইলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
পরে মোবাইল ফোনে জাতীয়তাবাদী ইন্টার্ণ চিকিৎসক কামরানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যান্টিন পরিচালনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর ক্যান্টিনটি জামায়াত-শিবির দখলে নেয়। তবে, এখন যারা চালাচ্ছে তারা হয়তো আমার নাম ব্যবহার করছে। কিন্তু এখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কাগজপত্র দেখলে কোথাও আমার নাম পাবেন না।
কামরানের এই বক্তব্যের পরই প্রশ্ন আরও জোরালো হয় তাহলে কার অনুমতিতে চলছে ক্যান্টিন? কারা এর সঙ্গে জড়িত?
একাধিক সূত্রের দাবি, ইজারা ছাড়াই ক্যান্টিন পরিচালনা ও এর বিপরীতে অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়টি হাসপাতালের ক্যাশিয়ার মো. আলিমুজ্জামান অবগত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যাশিয়ার মো. আলিমুজ্জামান বিস্তারিত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে তিনি জানান, ক্যান্টিনের জন্য প্রতি বর্গফুট ২০ টাকা হিসাবে মাসে প্রায় ৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু এই টাকা কে দেন কিংবা কোন খাতে জমা হয় সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো তথ্য দেননি। বরং বিষয়টি জানার জন্য হাসপাতালের প্রধান সহকারী (বড়বাবু) মাহবুব হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
হাসপাতালের বড়বাবু মাহবুব হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনিও বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, আমি কিছুই জানি না। আমাদের অ্যাকাউন্টেন্ট হয়তো সব তথ্য বলতে পারবেন।
অ্যাকাউন্টেন্টের মোবাইল নম্বর চাইলে প্রথমে তার কাছে নম্বর নেই বলে জানান তিনি। পরে কলব্যাক করে অ্যাকাউন্টেন্টের সহকারী রাজুর একটি নম্বর দেন। রাজু মুঠোফোনে বলেন ক্যান্টিনের টাকা জমার বিষয়টি ক্যাশিয়ারের জানার কথা। এটা আমাদের বিষয় না।
ক্যান্টিন পরিচালনার বৈধতা ও চুক্তির বিষয়ে কথা হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, একটা চুক্তিনামার মাধ্যমে কিছু টাকা জমা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এটা আদৌ হয় কি না, সেটি আমার জানা নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ইজারা ছাড়া চুক্তিনামার মাধ্যমে ক্যান্টিন পরিচালনা কতটুকু বৈধ এমন প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি তিনি। তবে ৫ আগস্টের পর ক্যান্টিনটির দু’ দফা হাতবদল হয়েছে বলে স্বীকার করেন তত্ত্বাবধায়ক।
তিনি বলেন, আমিও চাই ক্যান্টিন ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হোক।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. সুজাত আহম্মেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ক্যান্টিনটি বর্তমানে কীভাবে পরিচালিত হয়, সেটি আমার জানা নেই। ইজারা ছাড়া গভর্নমেন্টকে টাকা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে আমি পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি। ইতোমধ্যে মোটরসাইকেল গ্যারেজটি ইজারা হয়েছে। ক্যান্টিনটিও ইজারা দেওয়ার জন্য পরিচালককে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলামের কাছে ক্যান্টিনের বর্তমান পরিচালনাকারী, ইজারা এবং চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাসপাতালের ক্যান্টিন ইজারা দেওয়ার নিয়ম নেই। এটি আগে যারা চালাচ্ছিল, তারা এখনও চালাচ্ছে।
কারা ক্যান্টিনটি পরিচালনা করছেন এমন প্রশ্ন করা হলে পরিচালক বলেন, ক্যান্টিনে গিয়ে খোঁজ নেন। এরপরই তিনি মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সরকারি হাসপাতালের একটি ক্যান্টিন কে পরিচালনা করছে, কী চুক্তির ভিত্তিতে করছে, মাসিক টাকা কোথায় এবং কোন খাতে জমা হচ্ছে এসব প্রশ্নে হাসপাতাল প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও দেখা গেছে স্পষ্টতার অভাব।
পরিচালক বলছেন, ক্যান্টিন ইজারা দেওয়ার নিয়ম নেই এবং আগে যারা চালাচ্ছিল তারাই চালাচ্ছেন। অথচ উপ-পরিচালক বলছেন, ইজারা ছাড়া সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা নেওয়ার সুযোগ নেই এবং ক্যান্টিন ইজারা দেওয়ার জন্য পরিচালককে জানানো হয়েছে। তত্ত্বাবধায়কও বলছেন, তিনি চান ক্যান্টিনটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হোক।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়- ইজারা না থাকলে ক্যান্টিনটি বর্তমানে কার অনুমতিতে চলছে? মাসে প্রায় ৪ হাজার টাকা কে বা কারা দিচ্ছেন? সেই অর্থ কোন খাতে জমা হচ্ছে? আর পরিচালনার সঙ্গে কারা যুক্ত?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, হাসপাতালের পরিচালক, উপ-পরিচালক, তত্ত্বাবধায়ক, ক্যাশিয়ার ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ যদি স্পষ্টভাবে বলতে না পারেন ক্যান্টিনটি কে পরিচালনা করছেন, তাহলে সরকারি হাসপাতালের ভেতরে এতদিন ধরে ক্যান্টিনটি পরিচালিত হচ্ছে কীভাবে? কার ইশারায় চলছে এই ক্যান্টিন, আর এর নেপথ্যই বা কে আছেন? এ বিষয়গুলো নিয়ে মানুষের মনে জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button