স্থানীয় সংবাদ

১২ গডফাদার, ২২৫ পাইকারÑখুলনায় মাদক-অস্ত্রের ভয়ংকর নেটওয়ার্ক

# বাহক-খুচরা কারবারিরা গ্রেপ্তার : নেপথ্যের মূল হোতারা অধরা
# মোবাইল-হোয়াটসঅ্যাপে অর্ডার : নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যাচ্ছে চালান

কামরুল হোসেন মনি ঃ মাদকের চালান, সঙ্গে অস্ত্রÑখুলনা বিভাগে অপরাধের এই যোগসূত্র নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে মাদকের পাশাপাশি রিভলভার, পিস্তল ও গুলি উদ্ধারের ঘটনায় মাদক ও অস্ত্র কারবারের সম্ভাব্য যোগসূত্র সামনে এসেছে। তবে অভিযানে বাহক ও খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও নেপথ্যের মূল নিয়ন্ত্রণকারীদের অনেকেই থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ১২ জনকে মাদক ব্যবসার ‘গডফাদার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে তারা গ্রেপ্তারও হয়েছেন। পাশাপাশি বিভাগের ১০ জেলায় তালিকাভুক্ত পাইকারি মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা ২২৫ জন। খুলনা বিভাগের মাদকের ১০ গডফাদারের মধ্যে বাগেরহাটে পাঁচজন, সাতক্ষীরায় তিনজন, নড়াইলে দুজন, খুলনায় একজন ও ঝিনাইদহে একজনকে মাদক ব্যবসার গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, তালিকাভুক্ত পাইকারি কারবারিদের মধ্যে খুলনায় ৩৮, যশোরে ২২, সাতক্ষীরায় ৪০, বাগেরহাটে ১৪, ঝিনাইদহে ১০, কুষ্টিয়ায় ৫২, চুয়াডাঙ্গায় ৭, নড়াইলে ১৫, মেহেরপুরে ২০ এবং মাগুরায় ৭ জন রয়েছেন।
তবে মাদক ব্যবসার ধরনও বদলে গেছে। নির্দিষ্ট আড্ডা, দোকান কিংবা স্পটে বসে বিক্রির পরিবর্তে এখন মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে চলছে অর্ডার ও সরবরাহ। ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্ডার নেওয়ার পর নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ে বাহকের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মাদকের চালান। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতার সরাসরি সাক্ষাৎও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন হচ্ছে না।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক এস কে ইফতেখার মোহাম্মদ উমায়ের বলেন, সাতক্ষীরা ও যশোর থেকে ফেনসিডিল, কুমিল্লা থেকে গাঁজা এবং চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবার চালান আসছে। বর্তমানে অভিযানে ইয়াবা বেশি উদ্ধার হচ্ছে। এরপর গাঁজা ও ফেনসিডিল উদ্ধার হচ্ছে। এসব চালান পরিবহনে নারীদের সম্পৃক্ততাও বেশি দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, বাহকরা গ্রেপ্তার হলেও তাদের পেছনে থাকা সরবরাহকারী ও মূল কারবারিদের শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ও লেনদেনের কারণে মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক আরও গোপনীয় হয়ে উঠেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্ত্রের কারবার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আহসানুর রহমান বলেন, “মাদক ও অস্ত্র একে অপরের সঙ্গে জড়িত।” গত ৭ মার্চ খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের নিজখামার এলাকায় অভিযানে মাদকের পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাকে তিনি বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
ওই অভিযানে একটি বাস থেকে দুই নারী যাত্রীর কাছ থেকে ৮০ বোতল কোডিন ফসফেটযুক্ত মাদক উদ্ধার করা হয়। পরে একই এলাকায় আরেকটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে সুরাইয়া পারভীন সুমির কাছ থেকে দুটি রিভলভার, তিনটি পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন ও ৯৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধারের কথা জানায় অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ১২ জনের বেশি ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস ও লেনদেনের বিষয়েও নজরদারি করা হচ্ছে। একই অপরাধীর নেটওয়ার্কে মাদক ও অস্ত্রের কারবার পরিচালিত হচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধিত) আইন, ২০২৬-এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ, বিজ্ঞাপন, মধ্যস্থতা ও যোগাযোগকেও অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদকসংক্রান্ত লেনদেনের বিষয়ও আইনের আওতায় এসেছে।
কেএমপির ডিবির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের কোনো সদস্য জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ১২ গডফাদার ও ২২৫ পাইকারি কারবারির এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে শুধু বাহক গ্রেপ্তার নয়, প্রযুক্তি ও অর্থের সূত্র ধরে মাদকের মূল নিয়ন্ত্রণকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button