স্থানীয় সংবাদ

খুমেক হাসপাতালের সরকারি ওষুধ যায় কোথায়?

অধিকাংশ-ই বাইরে থেকে কিনতে হয় রোগীদের

শেখ মোঃ জাকির হোসেন, খুমেক : খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একটি অংশকে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে- এমন অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের স্টকে এসব ওষুধ ও সামগ্রী থাকার পরও রোগীদের সেগুলো না দিয়ে বাইরে থেকে কিনতে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের।
বিশেষ করে জরুরি বিভাগ, সার্জারি ওয়ার্ড এবং প্রসূতি বিভাগের সিজারিয়ান রোগীদের ক্ষেত্রে সেলাইয়ের সুতা, ভায়োডিন, ব্যথানাশক ইনজেকশন, অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেও রোগীদের বাড়তি হাজার হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অপারেশনের জন্য ব্যবহৃত ভিক্রিল, প্রলিনসহ বিভিন্ন ধরনের সেলাইয়ের সুতা, স্যালাইন, সিরিঞ্জ, আইভি কেনুলা, গ্লাভস এবং মেরোপেনেম ১ গ্রাম, সেফট্রিয়াক্সোন ১ গ্রাম, কিটোরোলাকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী সরকারি সরবরাহে রয়েছে। তারপরও এসব সামগ্রীর একটি অংশ রোগীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না এমন অভিযোগই এখন সামনে এসেছে।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসার পরই অনেক ক্ষেত্রে বাইরে থেকে ওষুধ ও সেলাইয়ের সামগ্রী কেনার তালিকা দেওয়া হয়। বিশেষ করে সেলাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় দামি সুতা কেনার ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ বেশি।
তাদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ডবয়রা সেলাইয়ের সুতা ও অন্যান্য সামগ্রীর স্লিপ দিয়ে থাকেন। একটি সেলাইয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সামগ্রী কেনানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে অব্যবহৃত সামগ্রী কোথায় যায়, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রোগীর স্বজনরা।
প্রসূতি বিভাগে সিজারিয়ান রোগীদের স্বজনদের কাছ থেকে বাইরে থেকে ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী কেনানোর অভিযোগ তুলনামূলক বেশি।
রোগীর স্বজনদের ভাষ্য, একটি সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, সেলাইয়ের সুতা ও বিভিন্ন সামগ্রী কিনতেই ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি ব্যয় হচ্ছে।
রোগীর স্বজন আরাফাত হোসেন জানান, তার বোনের সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য বাইরে থেকে প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে কোনো ওষুধ না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
রোগী মো. সুমনের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর জরুরি বিভাগ থেকেই সেলাইয়ের সুতা, ভায়োডিন ও ব্যথার ইনজেকশনসহ বিভিন্ন ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হয়।
তিনি জানান, প্রথম দফায় প্রায় ২ হাজার ৪০ টাকার ওষুধ কিনেছেন স্বজনরা। পরে আরও প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকার ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। এ ছাড়া সেলাই করার জন্যও ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শুধু প্রসূতি বিভাগ নয়, সার্জারি ওয়ার্ডেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ফাতেমা বেগমের স্বজন মো. ইকবাল জানান, রোগীকে হাসপাতালে আনার পর সেলাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সুতা ও ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনতে বলা হয়। এসব কিনতে তার প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ রোগীর শরীরে মাত্র পাঁচটি সেলাই দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. আশরাফুজ্জামান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী রোগীকে সেলাই দেওয়ার আগে চিকিৎসকের অনুমতি নেওয়ার কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ডবয়রা সেই নিয়ম মানছেন না বলে অভিযোগ পেয়েছেন তারা।
তিনি বলেন, চিকিৎসকদের না জানিয়েও কখনো কখনো রোগীদের বাইরে থেকে ইনজেকশন কিনতে বলা হচ্ছে। বিষয়টি হাসপাতালের পরিচালককে জানানো হয়েছে। এরপরও পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রোগী ও স্বজনদের প্রশ্ন, সরকারি সরবরাহে থাকা সত্ত্বেও যদি সেলাইয়ের সুতা, ইনজেকশন ও অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হয়, তাহলে হাসপাতালের স্টকে থাকা এসব সামগ্রী যাচ্ছে কোথায়?
তাদের অভিযোগ, হাসপাতালের কিছু সরকারি স্টাফ ও আউটসোর্সিং কর্মচারীদের একটি অংশ রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনা সেই ওষুধই আবার হাসপাতালের সামনের ফার্মেসিতে বিক্রি করে দেয়। জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, সার্জারি ওয়ার্ড এবং প্রসূতি বিভাগের নরমাল ডেলিভারি ইউনিটসহ বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করা কিছু কর্মচারী এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের। যা সঠিক তদন্ত করলে কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং সরকারি সরবরাহের কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা সামগ্রী বাইরে চলে যাচ্ছে কি না, তা বেরিয়ে আসবে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হাসপাতালের স্টকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সেলাইয়ের সুতা, বিভিন্ন ইনজেকশন ও অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে। এগুলো রোগীদের পাওয়ার কথা।
তার ভাষ্য, স্টকে থাকা সত্ত্বেও রোগীরা কেন এসব সামগ্রী পাচ্ছেন না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। কারও গাফিলতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরবরাহ করা ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী রোগীদের না দিয়ে বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ শুধু রোগীর বাড়তি ব্যয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরকারি সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির প্রশ্নও জড়িত।
একদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রয়োজনীয় সেলাইয়ের সুতা, ইনজেকশন ও অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন সামগ্রী স্টকে রয়েছে।
অন্যদিকে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, এসব সামগ্রী না পেয়ে তাদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। ফলে এখন মূল প্রশ্ন- স্টকে থাকা ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী রোগীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না কেন?
অভিযোগের সত্যতা থাকলে কারা রোগীদের বাইরে থেকে কেনাকাটায় বাধ্য করছে, সরকারি সরবরাহের সামগ্রী কোথায় যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে কোনো কর্মচারী বা অন্য কেউ জড়িত কি-না তা স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে তা বের করে আনা জরুরি। একই সঙ্গে প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী রোগী ও স্বজনরা।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button