অসহনীয় লোডশেডিং : উত্তপ্ত সংসদ

মিটারের ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ বন্ধের দাবি
কুইক রেন্টালের ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে প্রশ্ন
বিরোধী দলের টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব
মিটার ভাড়া মওকুফে লাগবে ২৯ হাজার কোটি টাকা
৫০০ মেগাওয়াট যুক্ত করার উদ্যোগ
প্রবাহ রিপোর্ট : দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হলেও গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে জাতীয় সংসদে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিলের মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংসদ সদস্যরা।
চলমান সংকটের বাস্তব চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধানের রোডম্যাপ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, “মিথ্যা আশ্বাস বা হাস্যকর অজুহাত দিয়ে বিদ্যুৎ সংকট আড়াল করার কোনো সুযোগ নেই।”
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধির আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া, লোডশেডিং, ভূতুড়ে বিল, মিটার ভাড়া ও ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
গ্রামে ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না : ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। অথচ কোথাও কোথাও মানুষকে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ এমন কোনো বিষয় নয়, যা মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা যায়। বিদ্যুৎ থাকলে মানুষ তা দেখতে পায়, ফ্যান ঘুরলে সেটিও বোঝা যায়। তাই বাস্তবতা আড়াল করে কোনো লাভ নেই। ” সরকারের হাতে কতটুকু বিদ্যুৎ আছে, কতটুকু ঘাটতি রয়েছে এবং সেই ঘাটতি পূরণে কত সময় লাগবে এসব তথ্য জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর কিংবা পাঁচ বছরের পরিকল্পনা থাকলে সেটিও জনগণকে জানানো উচিত। তাহলে মানুষও পরিস্থিতি বুঝে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে।
‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ বন্ধের দাবি : আলোচনায় অংশ নিয়ে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বিদ্যুৎ বিলের ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়াকে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ আখ্যা দিয়ে তা বন্ধের দাবি জানান।
তিনি বলেন, “দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও অনেক এলাকায় নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে।”
তার দাবি, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া প্রায় ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, শিল্পকারখানাকে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেওয়া এবং জ্বালানি খাতে জরুরি সেল গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
কুইক রেন্টালের ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে প্রশ্ন : কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেন ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তিনি বলেন, “সাধারণত এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি করা হয়েছিল। ওই সময়ের মধ্যে কেন্দ্র স্থাপনে করা বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হলে তা জনগণের অর্থের অপচয়।”
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা না নিলে একই ধরনের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বারবার তৈরি হবে। সরকার পরিবর্তন হলেই হবে না, জনগণের অর্থ অপচয়ের সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে।”
বিরোধী দলের টাস্কফোর্সের প্রস্তাব : বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাবও দেন বিরোধীদলীয় নেতা। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “প্রয়োজন হলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের একটি দল দেওয়া হবে। সরকার ও বিরোধী দলের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স বা বিশেষ সেল গঠন করে বিদ্যুৎ খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা যেতে পারে।”
তিনি বলেন, “এ কাজে বিরোধী দলের কোনো কৃতিত্বের প্রয়োজন নেই। সরকার চাইলে পুরো কৃতিত্বই নিতে পারে। তাদের লক্ষ্য কৃতিত্ব নেওয়া নয়, বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করা।”
সরকারের পাল্টা বক্তব্য : সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে আগের সরকারের ভুল নীতি, আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনার প্রভাব রয়েছে।
সরকারি পক্ষ জানায়, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, ভোলার গ্যাস কাজে লাগানো, মাতারবাড়ীতে এফএসআরইউ স্থাপন, পাইপলাইন সম্প্রসারণ এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেন, “বিদ্যুৎ খাতের সংকট সমাধানে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে এবং ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ”
মিটার ভাড়া মওকুফে লাগবে ২৯ হাজার কোটি টাকা : মিটার ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফের দাবি প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সারাদেশের গ্রাহকদের একসঙ্গে মিটার ভাড়া মওকুফ করতে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একবারে এত অর্থ ব্যয় করা সম্ভব নয়। তবে গ্রাহক নিজ খরচে মিটার কিনলে তাকে আর মাসিক মিটার ভাড়া দিতে হবে না বলে জানান তিনি।
২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ গ্রাহককে ডিজিটাল প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।
৫০০ মেগাওয়াট যুক্ত করার উদ্যোগ : প্রতিমন্ত্রী জানান, মেয়াদ শেষ হওয়া পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ না দিয়ে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের বন্ধ ইউনিট চালুর প্রস্তুতিও চলছে। এ ছাড়া এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ, রুফটপ সোলার স্থাপনে শুল্ক-কর সুবিধা এবং উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকারের কাছে বিক্রির সুযোগ দেওয়ার কথা জানান তিনি। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জ্বালানি খাতকে আরও টেকসই করা বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব পদক্ষেপ চান বিরোধীদলীয় নেতা : সরকারের পরিকল্পনার কথা শোনার পর বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “পরিকল্পনা ও আশ্বাসের পাশাপাশি জনগণকে বাস্তব পরিস্থিতিও জানাতে হবে।”
তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ সংকট কোনো দলের একার সমস্যা নয়। একটি দেশ যখন দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ সংকটে থাকে, তখন অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” তাই দলীয় হিসাবের বাইরে গিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দ্রুত কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদের আলোচনায় বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি চিকিৎসকের শূন্যপদ পূরণ, আট বিভাগে ক্যানসার হাসপাতাল চালু, হামের টিকা, ওয়াটার বাস, চট্টগ্রাম বন্দরের জমি, ওষুধের দাম এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার বিষয়ও উঠে আসে।



