জাতীয় সংবাদ

দেশে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও ভর্তির রেকর্ড, খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ৩

ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের বিশেষ অভিযান ১২ সেপ্টেম্বর থেকে

প্রবাহ রিপোর্ট : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ১ হাজার ৫৭১ জন। মঙ্গলবার (০৮ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আগস্ট মাসেই মারা গেছে ৪৩ জন। এ ছাড়া জানুয়ারিতে দুই, ফেব্রুয়ারিতে দুই, মে মাসে এক, জুনে ১৩ ও জুলাইয়ে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৩৩ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৯৬, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৩৪ ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ৪০৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে।
অন্যান্য বিভাগের মধ্যে বরিশালে ১৪২, চট্টগ্রামে ১৭৭, খুলনায় ২৪২, ময়মনসিংহে ৭৭, রাজশাহীতে ১১৬, রংপুরে ৭১ ও সিলেটে ৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু নিয়ে ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪২ হাজার ১২৭ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে ৩ হাজার ২১৮ জন।
খুলনা বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় ২৪২ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি, মৃত্যু ৩ :
এদিকে, খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুর সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নতুন করে ২৪২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুইজন এবং বাগেরহাটে একজনের ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে পরিচালক ডা: শেখ মো: মোশাররফ হোসেন স্বাক্ষরিত প্রকাশিত ডেঙ্গু রোগীর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হওয়া ২৪২ রোগীর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০৬ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৩৬ জন।
জেলাভিত্তিক হিসাবে গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় ৯৭ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬৫ জন, বাগেরহাটে ১৭ জন, সাতক্ষীরায় ৮ জন, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন, যশোরে ৩৭ জন, ঝিনাইদহে ২ জন, মাগুরায় ২ জন, নড়াইলে ২ জন, কুষ্টিয়ায় ৩ জন, চুয়াডাঙ্গায় ১ জন এবং মেহেরপুরে ৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সরকারি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ৭ হাজার ৬৬০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে ৬ হাজার ৫৭৮ জন রোগী ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৮৭৮ জন। এ সময়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য মোট ১৭৯ জনকে রেফার্ড করা হয়েছে।
এদিকে, প্রতিবেদনে ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সর্বমোট ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের। এর মধ্যে খুলনা জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ২ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০ জন, বাগেরহাটে ২ জন এবং যশোরে ১ জনের মৃত্যু হয়।
বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যার দিক থেকে খুলনা জেলা ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চাপ সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে খুলনা জেলায় বর্তমানে ৩৮০ জন এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৮০ জন, বাগেরহাটে ১০৮ জন, সাতক্ষীরায় ১৮ জন, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭ জন, যশোরে ৯৮ জন, ঝিনাইদহ ১৭ জন, মাগুরায় ১৪ জন, নড়াইলে ২৩ জন, কুষ্টিয়ায় ১২ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৫ জন এবং মেহেরপুরে ৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের বিশেষ অভিযান :
অপরদিকে, আগামী ১২ সেপ্টেম্বর (শনিবার) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি। ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় আগামী তিন মাসকে ঝুঁকিপূর্ণ সময় বিবেচনায় নিয়ে এ কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে আয়োজিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে নির্দেশনা দেন।
সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশকনিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
কর্মসূচির আওতায় মহানগর এলাকায় সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকেরা কার্যক্রম সমন্বয় করবেন। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) স্থানীয় পর্যায়ের কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকবেন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক এ অভিযানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি স্কাউট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), গার্ল গাইডস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা হবে।
প্রতি শনিবার স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও স্থাপনায় গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেবেন। একইসঙ্গে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে—এমন জায়গা চিহ্নিত করা এবং মানুষকে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী মাঠপর্যায়ের পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে টেলিভিশনে জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা নিয়মিতভাবে তুলে ধরতে সংশ্লিষ্টদের বলেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী তিন মাস ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও আশপাশের এলাকা নিয়মিত পরিষ্কার রাখার বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, মন্ত্রপিরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. শাকিরুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানাসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button