খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর রুকন সম্মেলন

রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে নিজের আমল
ও আখিরাতের সফলতার জন্য কাজ করতে হবে
– এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি
আওয়ামী লীগকে রিফাইন করে নতুন রূপে রাজনীতিতে ফেরানোর চেষ্টা চলছে-মিয়া গোলাম পরওয়ার
স্টাফ রিপোর্টার ঃ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি বলেছেন, শুধু দল ক্ষমতায় গেলেই হবে না, প্রত্যেক ব্যক্তিরও বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। দলের বিজয় হতে পারে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন, আর ব্যক্তির বিজয় হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ। তাই রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে নিজের আমল ও আখিরাতের সফলতার জন্য কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, মুসলমানদের সঙ্গে কুরআনের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে। শুধু মুখে ইসলামের কথা বললে হবে না, জীবনে তার বাস্তব প্রয়োগ থাকতে হবে। মাওলানা মওদুদীর ‘সত্যের সাক্ষ্য’ প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, মৌখিক সাক্ষ্যের পাশাপাশি বাস্তব সাক্ষ্য দিতে হবে। মানুষের কথা ও কাজের মধ্যে মিল থাকতে হবে। মুসলমানদের বর্তমান অবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংখ্যায় বিপুল হলেও মুসলমানরা বিশ্বের অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০০ কোটি মুসলমানের বিপরীতে ইসরায়েলি ইহুদিদের সংখ্যা উল্লেখ করে দাবি করেন, অল্পসংখ্যক হয়েও তারা বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। তাঁর মতে, এর অন্যতম কারণ মুসলমানদের মধ্যে ঈমানের শক্তি ও বাস্তব চেতনার ঘাটতি। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে নগরীর আল ফারুক সোসাইটি মিলনায়তনে খুলনা মহানগরীর রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ সব কথা বলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য খুলনা মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মহানগরী সেক্রেটারি এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল এমপির পরিচালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী সদস্য ও খুলনা অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি ও সহকারী পরিচালক মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি। সম্মেলনে শুভেচ্ছা বক্তৃতা করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরী সভাপতি রাকিব হাসান। এতে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মাস্টার শফিকুল আলম, মহানগরী নায়েবে আমীর অধ্যাপক নজিবুর রহমান, খুলনা জেলা সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, মহানগরী সহকারী সেক্রেটারি এডভোকেট শাহ আলম, প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও আজিজুল ইসলাম ফারাজী, খুলনা জেলা সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, মহানগরী অফিস সেক্রেটারি মীম মিরাজ হোসাইন, কর্মপরিষদ সদস্য ড. আবু রুবাবা, মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আ ন ম আব্দুল কুদ্দুস ও মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক, মহানগরী যুব বিভাগের সভাপতি মুকারম বিল্লাহ, তারবিয়াত বিভাগের সেক্রেটারি মাওলানা শেখ মোহাম্মদ অলিউল্লাহ, সমাজ কল্যাণ বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, দাওয়া ও প্রকাশনা সেক্রেটারি মাওলানা শাহারুল ইসলাম, পেশাজীবী বিভাগীয় সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মোল্লা আলমগীর, এডভোকেট শফিকুল ইসলাম লিটন, খুলনা সদর থানা আমীর এস এম হাফিজুর রহমান, সোনাডাঙ্গা থানা আমীর জি এম শহীদুল ইসলাম, খালিশপুর থানা আমীর আব্দুল্লাহ আল মামুন, দৌলতপুর থানা আমীর মুশাররফ আনসারী, আড়ংঘাটা থানা আমীর মনোয়ার আনসারী, ব্যবসায়ী থানা সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, হাফেজ ইমরান খালিদ, খুলনা সদর থানা সেক্রেটারি আব্দুস সালাম, সোনাডাঙ্গা থানা সেক্রেটারি জাহিদুর রহমান নাঈম, খালিশপুর থানা আব্দুল আউয়াল, দৌলতপুর থানা মাওলানা মহিউদ্দীন, আড়ংঘাটা থানা সেক্রেটারি শেখ ফিরোজ আহমেদ তুহিন, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হেফজুর রহমান প্রমুখ ।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের উদাহরণ দিয়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর আজহারুল ইসলাম এমপি বলেন, মদিনায় মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠার সময় মুসলমানদের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। মসজিদে ছিল না আজকের মতো জাঁকজমক, ছিল না দামি কার্পেট বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু তখন পারস্য ও রোমের মতো শক্তিশালী সাম্রাজ্য মুসলমানদের ভয় করত। এখন মুসলমানদের অনেক মসজিদ অত্যাধুনিক, পোশাক-পরিচ্ছদ ও জীবনযাপনে আড়ম্বর রয়েছে; কিন্তু সেই ঈমানি শক্তি নেই। তিনি বলেন, মানুষ এখন দুনিয়াবি সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কে বেশি বাড়ি করবে, কে বেশি সম্পদের মালিক হবে এসব নিয়ে ব্যস্ততা বেড়েছে। অথচ ইসলামে দুনিয়ার সম্পদ অর্জন নিষিদ্ধ নয়। সম্পদ থাকলেই যাকাত ও দান-সদকা করা সম্ভব। তবে সম্পদ অর্জনের জন্য যেকোনো পথ বেছে নেওয়া যাবে না। প্রতিযোগিতা করতে হবে আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাত লাভের জন্য।
এ টি এম আজহার বলেন, দলের বিজয় মানেই ব্যক্তির বিজয় নয়। কোনো ব্যক্তি অন্যায়ভাবে ভোট চুরি বা অনৈতিক পদ্ধতিতে জামায়াতকে ক্ষমতায় আনলেও তাতে তার ব্যক্তিগত মুক্তি হবে না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজন চোর ধনী ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা চুরি করে গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেও তার চুরি বৈধ হয়ে যায় না। একইভাবে দলের জন্য অন্যায় করলে সেই অন্যায়ের দায় ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। জামায়াতে যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্য শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ করা। পাশাপাশি প্রত্যেক কর্মীকে নিজের আখিরাতের সফলতার জন্যও কাজ করতে হবে। কারণ, আল্লাহর কাছে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজের কাজের হিসাব দিতে হবে। এ টি এম আজহারুল ইসলাম সূরা আস-সফের আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, আল্লাহ এমন একটি ব্যবসার কথা বলেছেন, যা মানুষকে কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করবে। সেই ব্যবসার মূলধন হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম। এখানে শুধু অর্থ নয়, মানুষের মেধা, শক্তি, সময়, যোগ্যতা ও সামর্থ্যও আল্লাহর পথে ব্যয় করার বিষয় রয়েছে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগকে রিফাইন করে নতুন রূপে রাজনীতিতে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর দাবি, সরকারের ভেতরের কিছু ব্যক্তি ও দিল্লির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহল এ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছে। তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে আওয়ামী লীগের পক্ষে সহজে রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের একক কৃতিত্ব নয়। এটি আল্লাহর রহমত এবং ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের ফল। দীর্ঘ ১২ থেকে ১৪ বছরের রাজনৈতিক অন্ধকারের পর মানুষ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল। গণঅভ্যুত্থানে বহু মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তার লক্ষ্য ছিল দুর্নীতি, দমন-পীড়ন, বৈষম্য, দলীয়করণ ও অর্থপাচারমুক্ত একটি নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের এই নেতা। তাঁর ভাষ্য, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে থাকা কয়েকজনের অতীত বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। অতীতের বিএনপি সরকারের সময়ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার উদাহরণ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মিযা গোলাম পরওয়ার।
দেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় এ ধরনের রাজনৈতিক শক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর সেই পৃষ্ঠপোষকতা কমে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একসময় শিবিরের রাজনৈতিক কর্মকা-কে ক্যাম্পাসে বাধাগ্রস্ত করা হলেও এখন তারা প্রকাশ্যে রাজনীতি করছে। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের বিজয়কে তিনি ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাজনীতির প্রতি তরুণদের সমর্থনের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাম, বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ যে পরিচয়েই রাজনীতি করা হোক, শেষ পর্যন্ত আদর্শিক অবস্থানই রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামী তার আদর্শের রাজনীতি চালিয়ে যাবে।

