জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের সামনে ৭ চ্যালেঞ্জ

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের কূটনীতির ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন ড. খলিলুর রহমান। তবে মর্যাদাপূর্ণ এই দায়িত্ব একইসঙ্গে তাকে দাঁড় করিয়েছে একাধিক জটিল বৈশ্বিক সংকটের মুখোমুখি। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক পদ নয়; বরং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের সময়ে ১৯৩টি দেশের মধ্যে ঐকমত্য তৈরির কঠিন দায়িত্ব। একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক হিসেবে খলিলুর রহমান জাতিসংঘ ব্যবস্থার ভেতরের রাজনীতি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত। এর আগে নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তবে এবার দায়িত্বের পরিধি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাকে শুধু বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, পুরো বিশ্ব সংস্থার একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে হবে। এমন এক সময়ে তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন জাতিসংঘের সামনে রয়েছে একাধিক বৈশ্বিক সংকট। এসব সংকট মোকাবিলায় সাধারণ পরিষদের সভাপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক বিভাজন। জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাত-এসব বিষয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। খলিলুর রহমানের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা যায়, যেখানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কেবল বিতর্কের জায়গা না হয়ে সমাধানের প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। অবশ্য তিনি তার ঘোষিত অগ্রাধিকারে শান্তি ও নিরাপত্তা, সংঘাত প্রতিরোধ এবং বেসামরিক নাগরিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। গাজা সংকট ঃ গাজা যুদ্ধ জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতার বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে মানবিক বিপর্যয়, অন্যদিকে সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক বিভাজন-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে। খলিলুর রহমানকে এমন অবস্থান নিতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং শান্তি আলোচনার বিষয়গুলো সামনে থাকে। একইসঙ্গে বড় শক্তিগুলোর কূটনৈতিক অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে। জাতিসংঘ সংস্কার ঃ জাতিসংঘকে অনেকেই ১৯৪৫ সালের কাঠামোয় আটকে থাকা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমালোচনা করেন। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, উন্নয়ন অর্থায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি-সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের দাবি বাড়ছে। খলিলুর রহমানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের স্বার্থের সঙ্গে অনেক সময় বৃহত্তর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দাবি সাংঘর্ষিক হয়। তিনি তার মেয়াদের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে জাতিসংঘের কার্যকারিতা বাড়ানো ও আস্থা পুনর্গঠনের কথা বলেছেন। জাতিসংঘের অর্থ সংকট ঃ জাতিসংঘ বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খলিলুর রহমানকে এমন একটি সময়ে নেতৃত্ব দিতে হবে, যখন সদস্য দেশগুলো একদিকে জাতিসংঘের কার্যকারিতা বাড়ানোর দাবি করছে, অন্যদিকে অর্থায়নে অনীহা দেখাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ঃ জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ ও খাদ্য নিরাপত্তা-এসব বিষয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। খলিলুর রহমানের জন্য এটি একটি কূটনৈতিক সুযোগও। জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় তিনি ভূমিকা রাখতে পারেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি ঃ জাতিসংঘের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও তথ্য বিভ্রান্তি। উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রযুক্তিতে সমান সুযোগ ও নিরাপত্তা চায়। খলিলুর রহমান তার অগ্রাধিকারের মধ্যে উদীয়মান প্রযুক্তির শাসন ব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঃ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করে আসছে। রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু বাংলাদেশের জন্যই একটি সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানে আন্তর্জাতিক সব পক্ষকে এক জায়গায় এনে সংকটের সমাধানে এগিয়ে যাওয়াও খলিলুর রহমানের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত ঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, একজন বাংলাদেশির জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি অর্জন। তবে তিনি বলেন, এই পদটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের জাতীয় স্বার্থ তুলে ধরার জায়গা নয়; বরং সভাপতিকে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের স্বার্থের প্রতি সমান দৃষ্টি রেখে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তার মতে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির এই সুযোগ বাংলাদেশ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে, তা নির্ভর করবে ঢাকার কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, কৌশল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখার সক্ষমতার ওপর। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের সাবেক প্রধান লেখক ও পরিচালক ড. সেলিম জাহান বলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করা। তিনি বলেন, সভাপতির আচরণ ও সিদ্ধান্তে এমন কোনো ধারণা তৈরি হওয়া উচিত নয় যে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশ, অঞ্চল বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছেন। বরং সব সদস্যরাষ্ট্রের আস্থা ধরে রেখে ঐকমত্য তৈরির মাধ্যমে বৈশ্বিক ইস্যুগুলো এগিয়ে নেওয়াই হবে সভাপতির মূল চ্যালেঞ্জ। কী বলছেন খলিলুর রহমান? ঃ জাতিসংঘের সংস্কারকে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ড. খলিলুর রহমান। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, জাতিসংঘের সংস্কারের বিষয়টিকে খুব, খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন এমন একটি পরিস্থিতি চলছে, যেখানে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তাই শুধু আজকের জন্য নয়, বরং আগামীকাল বা ভবিষ্যতের জন্য এই সংস্থাকে উপযুক্ত করে তুলতে হলে অবশ্যই গভীর সংস্কার করতে হবে।’ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার এক বিশাল আকুতি রয়েছে। আর আমরা তাদের জাতিসংঘের সামনে নিয়ে এসেছি। আমরা তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছি। সামনের দিনগুলোতেও আমি এই কাজ চালিয়ে যাব।’ এর আগে জাতিসংঘের সভাপতি পদে নির্বাচনী অঙ্গীকারে খলিলুর রহমান বলেছিলেন, শান্তি, নিরাপত্তা ও সবার জন্য ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা এবং জলবায়ু পদক্ষেপ ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে কাজ করবেন তিনি। একইসঙ্গে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম, অভিবাসী ও শরণার্থী, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবনের আওতায় ডিজিটাল গভর্নেন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উদীয়মান প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ এবং জাতিসংঘ সংস্কারের কথাও বলেছিলেন তিনি। চার দশক পর আবারও বাংলাদেশি সভাপতি ঃ উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে শপথ নেন খলিলুর রহমান। এর আগে গত ২ জুন জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তাকে ইউএনজিএর ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত করেন। নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে আট ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। ১৯৮৬ সালে ইউএনজিএর ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। চার দশক পর আবারও একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক বিশ্বের বৃহত্তম বহুপাক্ষিক ফোরাম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিলেন।



