স্থানীয় সংবাদ

দৌলতপুরে দিন-দুপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে পাট শ্রমিক নিহত

# ঘটনাস্থল হতে এক রাউন্ড তাজা গুলি ও খোসাসহ অন্যান্য আলামত জব্দ
# সুরাতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ হস্তান্তর, পরিবারের আহাজারি
# আইনগত পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন, জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে : পুলিশ

স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর থানার মোড়স্থ খুলনা-যশোর সড়কের উপর শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) আনুমানিক সকাল ৮ টার দিকে জলিল মুন্সি (৩৫) নামের এক যুবককে দিন-দুপুরে প্রকাশ্যে গুলি করে পালিয়ে যায় মোটর সাইকেলযোগে আসা একদল দুবৃর্ত্তরা। দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত যুবক দৌলতপুর থানাধীন ইস্পাহানী কলোনী এলাকার বাসিন্দা ও মুদি ব্যবসায়ী দেলোয়ার মুন্সির ছেলে এবং পেশায় সে একজন পাট শ্রমিক।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল আনুমানিক ৮ টার দিকে নিহত জলিল দৌলতপুর থানার মোড়স্থ ইস্পাহানী কেলোনী (কুলিবাগান) এলাকার খুলনা-যশোর সড়কের পূর্বপাশে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। এসময় মোটর সাইকেলযোগে আসা দুবর্ৃৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে পালিয়ে যায়। দুর্বৃত্তদের ছোঁড়াগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, তাৎক্ষনিক স্থানীয়রা ও পুলিশ ঘটনাস্থল হতে গুলিবিদ্ধ যুবককে উদ্ধার করে খুমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষনা করে।
ওই ঘটনার খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক পুলিশের উধ্বর্তন কর্মকর্তা, র‌্যাব-৬ এর সদস্যবৃন্দসহ পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। ঘটনাস্থল হতে এক রাউন্ড তাজা গুলি ও গুলির খোসাসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করেন তারা। আলামত, সিসিটিভি ফুটেজসহ নানামুখি বিষয়কে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই তদন্তের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি খুনের ঘটনায় জড়িতদেরও গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্রাথমিক সুরাতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। একই দিন বাদ মাগরিব ইস্পাহানী কলোনী জামে মসজিদ কমপ্লেক্সের সামনে নিহতের জানাযা নামাজ শেষে সরকারি মহেশ^রপাশা (সাড়াডাঙ্গা) কবরখানায় দাফন সম্পন্ন হয়। পাট শ্রমিক জলিলের হত্যাকা-ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং এলাকার সর্বত্র এ ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টিও হয়েছে।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিহত জলিল বা তার পরিবারের সাথে কারোও পূর্বের কোনো শত্রুতা নেই, তবে ৩/৪ দিন ধরে জলিলের ফোনে কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কে বা কারা তাকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। পরিবার সূত্রে আরও জানা গেছে, হত্যাকা-ের দিন একটি ফোন পেয়ে ঘর হতে বেড়িয়ে যায় জলিল। তার কিছুক্ষন পরই দুর্বৃত্তরা জলিলকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে,তাদের গুলিতে নিহত হন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, দুর্বৃত্তরা কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে জলিলকে ঘর হতে ডেকে নিয়ে এ খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। শোকাহত পরিবার এ হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত, খুনিদের খুঁজে বের করা, গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন প্রশাসনের নিকট।
পুলিশ জানায়, শনিবার সকালে ইস্পাহানী কোলনী এলাকার খুলনা-যশোর সড়কের পূর্বপাশে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা নিহত জলিলের উপর মোটর সাইকেলযোগে আসা দুর্বৃত্তরা লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে পালিয়ে যায়। রাস্তায় আমাদের টহল পার্টি ছিল। ওই খবরে তাৎক্ষনিক ঘটনাস্থলে পৌছায় পুলিশ। পুলিশ ও স্থানীয়দের সহয়তায় গুলিবিদ্ধ জলিলকে উদ্ধার করে খুমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষনা করেন। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্রাথমিক সুরাতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে সকল আইনগত প্রক্রিয়ার কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্তের কার্যক্রম চলমান আছে, এছাড়াও নিহতের পরিবারের কাছ থেকে এজাহার পাওয়ার পর পরবর্তী আইগত পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে বলেও জানায় পুলিশ।
পুলিশ আরও জানায়, ঘটনাস্থল হতে এক রাউন্ড তাজা গুলি ও এক রাউন্ড গুলির খোসাসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়। আলামত, সিসিটিভি ফুটেজসহ নানামুখি বিষয়কে সামনে নিয়ে তদন্তের কার্যক্রম শুরুর পাশাপাশি জড়িতদেরও গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারনা, সম্প্রতি সময়ে খুলনায় ঘটে যাওয়া অধিকাংশ খুনের ঘটনার পেছনে মাদককারবারি, মাদকের টাকা ভাগাভাগি বা পূর্ব শত্রুতার জের ধরে খুনের বিষয় উঠে এসেছে। এ সংক্রান্তেও তা হতে পারে বলে প্রাথমিক ধারনা। তবে এ ঘটনাটির গুরুত্বের সাথে সুষ্ঠু তদন্ত ও আসামী গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে বলেও জানায় পুলিশ।
এদিকে, নিহত পাট শ্রমিক জলিলের হত্যাকা-ের ঘটনায় নিহতের পরিবার, আত্মীয়-স্বজনসহ সমবয়সী, শুভাকাঙক্ষীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের বাড়ীতে গিয়ে পরিবারের আহাজারি ও শোকের মাতব দৃশ্যমান হয়। ৫ সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে জলিলের পিতা-মাতা শোকে পাথর ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। পিতা-মাতা একমাত্র পুত্র সন্তান হারিয়ে, স্বামী হারিয়ে বিধবা স্ত্রী ও পিতাকে হারিয়ে ছোট্ট অবুঝ দুটি শোকে নিথর হয়ে পড়েন। তাদের আহাজারি ও কান্নাকাটিতে গোটা এলাকার বাতাস ভারি হয়ে ওঠেছে।
নিহত জলিলের পিতা দেলোয়ার মুন্সি জানায়, আমার পরিবার বা জলিলের সাথে কারোও পূর্বের কোনো শত্রুতা নেই, তবে ৩/৪ দিন ধরে জলিলের ফোনে কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে (আমার অজানা) কে বা কারা তাকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। হত্যাকা-ের দিন একটি ফোন পেয়ে ঘর হতে বেরিয়ে যায় জলিল। তার কিছুক্ষন পরই দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয় আমার একমাত্র পুত্র। এ হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত, খুনিদের খুঁজে বের করা, গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।
নিহত জলিলের মা অশ্রুসিক্ত কন্ঠে জানান, আমার বাবাকে বাড়ী থেকে ফোনে ডেকে নিয়ে গুলি করে মেলে ফেললো খুনিরা। খুনিরা আমার একমাত্র ছেলেকে হত্যা করে ওর অবুঝ দুটি বাচ্চাকে এতিম করলো। ওর স্ত্রীকে বিধবার করলো, আমাকে সন্তান হারা করলো, ওর বোনরা ভাই হারা হলো। বিচার চেয়ে কি করবো, আমি কি আমার ছেলেকে আর ফিরে পাবো?
এ বিষয়ে ঘটনাস্থলে থেকে দায়িত্বপালন করা এসআই মো. আলমগীর হোসেন জানান, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে ঘটনাস্থল যায়, অতঃপর খুমেক হাসপাতালে পৌঁছায়, সেখানে মরদেহের প্রাথমিক সুরাতহাল সম্পন্ন করি। প্রাথমিক সুরাতহালে নিহতের বুকে ও পিঠে গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিক সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার ( ১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সকল আইনগত প্রক্রিয়ার কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিহতের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ওসি (তদন্ত) এএফএম জাহিদুল ইসলাম জানান, দৌলতপুর থানাধীন খুলনা যশোর সড়কের উপর দুর্বৃত্তরা এক যুবককে গুলিবিদ্ধ করে, অতঃপর খুমেক হাসপাতালে তার মৃত হয়। ময়নাতদন্তের শেষে নিহতের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করি। নিহতের পরিবারের কাছ থেকে এজাহার পাওয়ার পর পরবর্তী আইগত পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।
এ বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (উত্তর) সুদর্শন কুমার রায় জানান, দৌলতপুর থানা এলাকায় যুবক হত্যাকা-ের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের আলামত জব্দসহ বিভিন্ন বিষয়কে সামনে রেখে তদন্তের কার্যক্রম অব্যহত রেখেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে কি কারণে এই হত্যাকা-, হত্যাকা-ের প্রকৃত রহস্য উৎঘটন ও জড়িতদের শণাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনে সক্ষম হবে পুলিশ বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button