স্থানীয় সংবাদ

এপিসি স্কুলের কম্পিউটার অপারেটর মমিনুরের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

ওষুধের দোকানের আড়ালে প্রতারণার ফাঁদ
অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের
কারাগারে গেলেও ব্যবস্থা নেননি স্কুল কর্তৃপক্ষ

স্টাফ রিপোর্টার : নগরীর লবণচরায় অবস্থিত ‘এপিসি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর ও ‘মেসার্স এম.এ ফার্মেসী’র স্বত্বাধিকারী মোঃ মমিনুর রহমান ওরফে মমিন হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। মূলত: তিনি তার ওষুধের দোকানের ব্যবসার সাইনবোর্ড দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পেতে এ অর্থ আত্মসাৎ করেন। ইতিমধ্যেই তার বিরুদ্ধে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। থানা পুলিশ এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর তদন্তেও তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
এদিকে, তিনি একটি মামলায় কারাবরণ করলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষা অফিস তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। ফলে বহাল তবিয়তে চাকরি, ব্যবসা এবং প্রতারণা করছেন মমিনুর। উল্টো তিনি পাওনাদারদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে হয়রানি করছেন। যদিও ইতিমধ্যে তার দায়েরকৃত একটি হয়রানিমূলক মামলা পুলিশের তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিএম আল আমিনও মমিনুরের কারাবরণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ রহস্যজনক কারণে বিষয়টি গোপন করেছেন। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ মমিনুরের কারাবরণের বিষয়টি গোপন রেখেছেন, অফিসে জানানো হয়নি।
অভিযুক্ত মো. মমিনুর রহমান ওরফে মোমিন হোসেন খুলনার কয়রা উপজেলার বগা গ্রামের মো. মুনসুর সরদারের পুত্র। তিনি বর্তমানে খুলনা মহানগরীর লবণচরা থানা এলাকার বোখারিয়া পাড়া (হাজী বাড়ি) এলাকায় বসবাস করছেন। একইসঙ্গে স্থানীয় এপিসি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি ‘মেসার্স এম এ ফার্মেসী’ নামেও তার একটি ওষুধের দোকান রয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) খুলনা এবং কয়রা থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে প্রাথমিক তদন্ত শেষে আসামি মমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) ও ৪২০ (প্রতারণা) ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।
ঘটনার বিবরণ : মামলার নথি, পুলিশ ও পিবিআই’র তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, কয়রা উপজেলার বগা গ্রামের আব্দুর রশিদ সানার পুত্র ব্যবসায়ী মোঃ মনিরুল ইসলামের সাথে একই গ্রামের মুনসুর সরদারের পুত্র মমিনুর রহমান ওরফে মোমিন হোসেনের সুসম্পর্ক ছিল। এর সুবাদে মমিনুর রহমান তার ওষুধ ব্যবসার (এম.এ ফার্মেসী) পরিধি বৃদ্ধি ও ওষুধ কেনার কথা বলে ব্যবসায়িক মুনাফার ৫% প্রদানের আশ্বাস দিয়ে মনিরুল ইসলামের কাছ থেকে ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত তিন দফায় মোট ৭ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। তিনি অগ্রণী ব্যাংক, জয়গীর মহল কয়রা শাখা থেকে বাদি মনিরুল ইসলামের কাছ থেকে বিভিন্ন তারিখে নগদ ও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এ অর্থ গ্রহণ করেন। তবে টাকা নেওয়ার পর মমিনুর রহমান কোন লভ্যাংশ প্রদান করেননি এবং পরবর্তীতে মূল টাকা ফেরত চাইলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানান ও যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। লিগ্যাল নোটিশ ও আদালতে মামলা: এদিকে, পাওনা টাকা ফেরত না পাওয়ায় বাদি মোঃ মনিরুল ইসলাম কয়রা জজ কোর্টের আইনজীবী জি.এম. আল-আমিনের মাধ্যমে গত বছরের ৬ নভেম্বর তার কর্মস্থল এপিসি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে মোমিনকে লিগ্যাল নোটিশ প্রদান করেন। নোটিশের বিষয়ে থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকেও অবহিত করা হয়। কিন্তু নোটিশের কোন সন্তোষজনক জবাব ও পাওনা টাকা ফেরত না দেওয়ায় পরবর্তীতে গত বছরের ১৮ নভেম্বর মোমিনকে আসামি করে পাওনাদার মনিরুল ইসলাম বাদি হয়ে কয়রার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত প্রতিবেদন ও বর্তমান অবস্থা : আদালতের নির্দেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) খুলনার এসআই এস.এম. পলাশ হোসেন সরজমিনে পরিদর্শন, সাক্ষী গ্রহণ ও ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আসামির বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। এছাড়া মমিনুর কর্তৃক পাওনাদার মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর খুলনা মহানগর হাকিমের আমলী আদালত লবণচরায় দায়েরকৃত মামলাটিও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এসআই মো. আজগর হোসেনের তদন্তে সত্যতা পাওয়া যায়নি মর্মে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।
আরও মামলা ও অভিযোগ : অপরদিকে, এপিসি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর মোঃ মমিনুর রহমান ওরফে মমিন হোসেন একইভাবে ব্যবসার কথা বলে প্রতারণা করে আল আমিন নামে আরো এক ব্যক্তির কাছ থেকে সাড়ে সাত লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ঘটনায়ও আদালতে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। কয়রা থানার উপ-পরিদর্শক মোঃ লুৎফর রহমান ঘটনার তদন্ত, ব্যাংক স্টেটমেন্ট যাচাই এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ শেষে গত ২১ মার্চ কয়রার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে আসামি মমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় আনা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার বিবরণ ও লেনদেন : মামলার নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, কয়রা উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের মো. আব্দুল গনি গাজীর পুত্র মোঃ আল আমিনের সাথে প্রতিবেশী ও পরিচিত হওয়ার সুবাদে মমিনুর রহমানের সুসম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে মমিনুর রহমান তার ‘মেসার্স এম.এ ফার্মেসী’র জন্য পাইকারি ওষুধ ক্রয়ের কথা বলে ব্যবসায়িক নিট মুনাফার ৫% লভ্যাংশ প্রদানের আশ্বাসে আল আমিনের কাছ থেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধার চান। সে মোতাবেক ২০২৪ সালের ১৭ মে নগদ ৪ লাখ টাকা এবং ২৩ মে তার নামীয় অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, জয়গীর মহল কয়রা শাখার চলতি হিসাব (নং-০২০০০২১১৫৭৯২৯৩)-এ আরও সাড়ে ৩ লাখ টাকা জমা করা হয়।
প্রতারণা ও আইনি পদক্ষেপ : চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও মমিনুর রহমান লভ্যাংশ কিংবা মূল টাকা পরিশোধ না করে টালবাহানা শুরু করেন। যে কারণে পাওনা টাকা আদায়ের লক্ষ্যে আইনজীবীর মাধ্যমে গত বছরের ১৯ নভেম্বর তাকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশ পাওয়ার পরও টাকা ফেরত না দেওয়া এবং পরবর্তীতে টাকা ফেরত চাইলে অস্বীকৃতি জানান মোমিন। এ ঘটনায় পরবর্তীতে আল-আমিন বাদী হয়ে মোমিনকে আসামি করে কয়রার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত কয়রা থানাকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন। পুলিশি তদন্ত ও বর্তমান অবস্থা : মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোঃ লুৎফর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ এবং অগ্রণী ব্যাংক জয়গীর মহল শাখা থেকে প্রেরিত হিসাব বিবরণী যাচাই করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হন। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আসামি মমিনুর রহমান বাদি আল আমিনের সরলতার সুযোগ নিয়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা আত্মসাৎ করে দ-বিধির ৪০৬/৪২০ ধারার অপরাধ করেছেন।
সর্বশেষ : একটি মামলার বাদী মনিরুল ইসলাম জানান, তার মামলায় আদালত কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর মোমিনুর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেন। গত ২৪ আগস্ট জামিন শেষ হলে তিনি কয়রার আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে প্রেরণ করেন। তবে, তার পাওনা অর্থ থেকে মাত্র দেড় লাখ টাকা পরিশোধ করার বিনিময়ে তিনি মামলা তুলে নিলে সে জামিল লাভ করে। অনেক হাত-পা ধরাধরি করে তাকে টাকা কম দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বাদী মনিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, মমিনুরের শশুর ইব্রাহিম সানা কয়রার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে সে অনেক ক্ষমতা দেখাতো। ফের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে তাকে দেখে নেয়া হবে বলেও হুমকি দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অভিযুক্ত মোমিন যা বললেন : প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এপিসি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর মমিনুর রহমান ওরফে মোমিন হোসেন এ প্রতিবেদকের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন। উল্টো তিনি জানতে চান, এ বিষয়ে তাকে কেন ফোন করা হয়েছে, যা পারেন তাই করেন।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য : এ বিষয়ে খুলনা জেলা শিক্ষা অফিসার এস, এম,
ছায়েদুর রহমান বলেন, কোন চাকরিজীবী কারাগারে গেলে তাকে সাময়িক বরখাস্তের বিধান রয়েছে। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ কেন মোমিনকে বরখাস্ত করেনি এবং শিক্ষা দপ্তরকে অবহিত করেনি এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button