আসছে ইউপি নির্বাচন : চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে সুষ্ঠু পরিবেশ

আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই বেশ কিছুদিন থেকে দেশের গ্রামেগঞ্জে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের হাওয়া বইছে। কোনো কোনো প্রার্থী নিজের প্রচারও জোর কদমে শুরু করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদগুলোয় নিজেদের প্রভাববলয় তৈরি করতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো হিসাব-নিকাশ করছে। এমন প্রেক্ষাপটে গত সোমবার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের সামনে ইউপি নির্বাচনের রোডম্যাপ তুলে ধরেন। দেশের বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যম খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছে। খবরে বলা হয়, আসন্ন ইউপি নির্বাচন নিয়ে গত সোমবার একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার জানান, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এগুলো চূড়ান্ত কিছু নয়। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইউপি নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে ১২ নভেম্বর। প্রথম ধাপেই ৮০টি উপজেলার ইউপিগুলোর নির্বাচন হবে। ঠাকুরগাঁও জেলা বাদে দেশের ৬৩ জেলার সদর বা কাছাকাছি উপজেলার ইউপিগুলো প্রথম ধাপের নির্বাচনের জন্য বেছে নেওয়া হবে। মোট সাত ধাপে নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপে ২০২৭ সালের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপে ২২ এপ্রিল, সপ্তম ধাপে ২৭ মে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, আজ বৃহস্পতিবার আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে ভোটের তারিখ চূড়ান্ত করা হবে। ইউপি নির্বাচন হলো তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একই সঙ্গে গ্রামীণ উন্নয়ন, স্থানীয় বিচারব্যবস্থা পরিচালনা এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবা পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন পরিষদের বিকল্প নেই। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সঙ্গে জনগণের নিত্য উঠাবসা থাকে। সংগত কারণে এ নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকে তুঙ্গে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, অতীতে অন্যান্য নির্বাচনের মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সবার সমান অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে নাগরিক সমাজে অসন্তোষ ছিল। ২০২১-২২ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে দেখা গেছে, বিনা ভোটে জনপ্রতিনিধি হওয়ার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। আশার কথা হলো, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের প্রাণ সঞ্চার হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের প্রথম বছরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সংসদ নির্বাচনের মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। একই সুরে কথা বলছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। সম্প্রতি তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ইউপি নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জ কী? জবাবে তিনি বলেন, ‘রক্তপাত এড়ানো। আমরা একাধিক ধাপে নির্বাচন করব। প্রথম ধাপের নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়ম কিছু হলে পরবর্তী ধাপে প্রতিকারমূলক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে জাতীয় পর্যায়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কাজেই শুধু ভয়ডরহীন নির্বাচনী পরিবেশই পারে সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে, যা বর্তমান সরকারের সামনে বড় পরীক্ষাও বটে। আমরা আশা করছি, সংসদ নির্বাচনের মতো ইউপি নির্বাচনও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। এ জন্য সরকারকে নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি মনে রাখা দরকার, সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণই পারে জাতিকে একটি সুন্দর ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দিতে।
