স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় গভীর রাতে মুখোশধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মহড়া : নিরাপত্তা কোথায়?

# সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আতঙ্কগ্রস্থ সর্বমহল, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন?
# অস্ত্রের মুখে ব্যবসায়ীর নগদ অর্থ লুট করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা
# মাদকের অর্থ জোগাড়ে গভীর রাতে এসি ও সার্ভিস তার চুরির হিড়িক

স্টাফ রিপোর্টার ঃ খুলনায় মাদকের অবাধ বিচরণ, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণে সন্ত্রাসীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। একের পর এক হত্যাকা-, হত্যা প্রচেষ্টা, কুপিয়ে জখম, চাঁদাবাজিসহ নানামুখি অপরাধমূলক কর্মকা-ের ঘটনায় এক সময়ের শান্তির নগরী হিসাবে পরিচিত খুলনা এখন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে আবার নগরীতে গভীর রাতে মুখোশধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মহড়া নগরবাসীকে আরও আতঙ্কিত ও ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলছে। শনিবার (১১ সেপ্টেম্বর) দিনগত গভীর রাতে খুলনা নগরীর দৌলতপুর থানাধীন দেয়ানা দক্ষিণপাড়াস্থ দেয়ানা মোহাম্মাদিয়া মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজে এ দৃশ্য ধরা পড়ে। ওই ফুটেজে দেখা যায় মুখোশধারী একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দলবদ্ধভাবে মহড়া প্রদর্শন করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সর্বত্র আতঙ্ক ও ব্যাপক আলোচনা জন্ম দেয়। ওই সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের এমন মহড়া দেখে এলাকাবাসীসহ সর্ব সাধারণ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন আলোচিত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরও ওই অপরাধীদের শণাক্তে পুলিশের তৎপরতা না থাকায়, তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ।
এখানেই শেষ নয়, গত মঙ্গলবার (১৪ সেম্পেম্বর) রাত আনুমানিক সাড়ে ১০ টার দিকে খুলনা মহানগরীর আড়ংঘাটা থানাধীন বাইপাস প্রবেশদ্বারের সেলিম শেখ নামের এক ব্যবসায়ীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মিকে করে হত্যার হুমকি প্রদর্শন করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা, তারা ওই ব্যবসায়ীর কাছে মোটা অঙ্কের নগদ অর্থলুট করে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রর্দশন করে অর্থ লুটের ঘটনায় ওই এলাকার ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। ওই ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং এরপর আইনগত পদক্ষেপ চলমান রেখেছেন বলে জানা গেছে। এখানেই শেষ নয়, গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় দৌলতপুর থানাধীন দেয়ানা উত্তরপাড়া হোসেন শাহ্ রোড এলাকায় অজ্ঞাত এক যুবক জনৈক এক ব্যাংক কর্মকর্তার বাড়িতে প্রবেশ করে ছাদে থাকা এসি চলাকালীন সময়ে তার কেটে নিয়ে যায়। যা সিসিটিভি ফুটেজে দৃশ্যমান হয়। ওই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ বলেছেন, খুলনা বর্তমানে খুনের নগরীতের পরিনত হয়েছে। পত্রিকার পাতা উল্টাতেই প্রথমেই চোখের সামনে খুন, কুপিয়ে জখম এসব খবর আসছে। খুন যে অতি সহজলভ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে শান্তির নগরীর খুলনায়। সন্ধ্যা নামতেই সমগ্র শহরজুড়ে আঙ্কত নেমে আসে। খুন, কুপিয়ে জখম, বিদ্যুৎতের সার্ভিস তার চুরি, মোটরসাইকেল চুরি এই সকল ঘটনায় নেপথ্যে রয়েছে মাদক, বিশেষ করে মাদকদ্রব্য ইয়াবার ভয়াবহ গ্রাস। আধিপত্য বিস্তার, মাদকের অবাধ ব্যবসা, ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি, মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করাসহ বিবিধ কারণে এসব অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে বলে তাদের মন্তব্য। খুলনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকল্পে পুলিশকে পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা আহ্বান জানা তারা। এ বিষয়ে দেয়ানা মোহাম্মাদীয়া মাদ্রাসার প্রচার সম্পাদক সবুজ বন্দ জানান, গভীর রাতে মুখোশধারী একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দলবদ্ধভাবে মহড়া প্রদর্শন করছে, সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পাই। ঘটনাটি এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ত্রাসের সৃষ্টি করেছে। এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এ বিষয়ে দেয়ানা মোহাম্মাদীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক কাম অফিস সহকারী মো. ফারুক প্রতিবেদককে জানান, গত ১১ সেপ্টেম্বর দিনগত গভীর রাতে মুখোশধারী একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দলবদ্ধভাবে মহড়া প্রদর্শন করছে, আমি সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পাই, বিষয়টি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জানাই এবং এলাকাবাসীও বিষয়টি অবগত হয়। ওই ঘটনায় এলাকাবাসী আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। ওই সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা পরের দিনের দিনগত গভীর রাতেও একই কায়দায় মহড়া প্রদর্শন করে এবং এলাকার জনৈক এক ব্যক্তির বাড়ীর সিসি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। তবে তারা অপরাধ কার্যক্রমের জন্য আসলেও সময় ও সুযোগ অনূকূলে না থাকার দরুন হয়তোবা অপরাধ সংঘঠিত করতে পারেনি। এবিষয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি হওয়া আড়ংঘাটা বাইপাস মোড় এলাকার ব্যবসায়ী সেলিম শেখ জানায়, মঙ্গলবার, তখন রাত প্রায় সাড়ে ১০ টা। মোড় ফাঁকা। ওই অজ্ঞাত এক যুবক দোকানে প্রবেশ করে। একটি নম্বরে ৫ হাজার টাকা বিকাশ করতে বলে। আমি টাকা চাইলে ইচ্ছা করে নানা অজুহাতে আমাকে বিলম্ব করানোর চেষ্টা করে। হঠাৎ সিগারেট জ্বালানোর নাম করে বাইরে উঁকি মেরে তার কোমরে থাকা রিভলবার বের করে আমার বুকে ঠেকিয়ে ধরে , গুলি করার হুমকি দিয়ে আমার ক্যাশে থাকা নগদ অর্থ লুট করে নেয়। অতঃপর বাইরে মুখোশধারী অপর এক যুবক মোটরসাইকেল নিয়ে হাজির হলে দ্রুত পালিয়ে চলে যায়। ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় আইনগত পদক্ষেপ চলমান রেখেছি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, বাড়ীতে এসি চলছিল। হঠাৎ এসি বন্ধ হয়ে গেল। ভেবেছিলাম হয়তো টেকনিক্যাল কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা। অতঃপর ছাদে উঠে দেখি এসিতে সংযোগ দেওয়া তামার তার কাটা। বিষয়টি সিসিটিভি ফুটেজে চেক দিয়ে দেখি অজ্ঞাত ব্যক্তি বাড়ীতে প্রবেশ করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করি। এ বিষয়ে দেয়ানা উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দা জিএম মাসুদুল হক মাসুম জানান, খুলনা বর্তমানে খুনের নগরী হিসাবে পরিচিত। প্রতিদিনই কোথা না কোথাও খুন, খুনের উদ্দেশ্যে জখমের ঘটনা ঘটছে। তবে দৌলতপুর তারপরও আবার দেয়ানা গ্রামে গভীর রাতে সশস্ত্র সস্ত্রাসীদের মহড়া আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবিয়ে তুলছে। আমি মনে করি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধে, মাদক অন্যতম কারন। প্রথমেই মাদক নিয়ন্ত্রন ও নির্মূল করা উচিৎ। তাহলে সন্ত্রাসী কার্যক্রমসহ সকল অপরাধ নিয়ন্ত্রনে চলে আসবে। এ বিষয়ে দৌলতপুর থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, আড়ংঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মতলুুবুর রহমান মিতুল জানান, খুলনা এখন সন্ত্রাসীদের আতুড় ঘরে পরিনত হয়েছে। সন্ত্রাসীরা নির্বিচারে হত্যাকা- ঘটাচ্ছে, মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? এটা সাধারন মানুষের প্রশ্ন। ইতোপূর্বে আড়ংঘাটার ইতিহাসে সবথেকে ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ৩২ ভরি সোনা ও অর্থ নিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত কোনো আসামী গ্রেপ্তার হয়নি। আর মাদক, যেন পণ্যের মতো মোড়ে মোড়ে বিক্রি হচ্ছে। মঙ্গলবার রাতে বাইপাস মোড়ে ব্যবসায়ীর বুকে বন্দুক ধরে সস্ত্রাসীরা নগদ অর্থলুট করে নিয়ে চলে যায়। বর্তমানে প্রশাসনের নিরব ভূমিকা জনগনকে ভাবিয়ে তুলছে। তবে আমাদের নির্বাচিত সরকার, সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং এই অঞ্চলের অভিভাবক সংসদ সদস্য ও হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল সন্ত্রাস বিরোধী কার্যক্রম বন্ধের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারী দিয়েছে।
এ বিষয়ে কেসিসির ৪ নং ওয়ার্ডের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবির বিশ্বাস বলেন, দৌলতপুর দেয়ানা মোহাম্মাদীয়া মাদ্রাসা এলাকায় গভীর রাতে দলবদ্ধ সন্ত্রাসীদের অবস্থান সত্যিই আতঙ্কের বিষয়, এটি অস্বীকার করা সুযোগ নেই। বিষয় অবগত হয়েছি, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। তিনি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সু-শাসনের জন্য নাগরিক(সুজন) এর খুলনা জেলা সভাপতি এড.কুদরত ই খুদা জানান, খুলনা বর্তমানে খুনের নগরী হিসাবে পরিচিত। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও খুন, জখম হচ্ছে। খুলনায় আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। এছাড়া সম্প্রতি দৌলতপুর এলাকায় সশস্ত্র সস্ত্রাসীদের মহড়া নাগরিকদের মাঝে আরও বেশি ভয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। খুলনায় আইন-শৃঙ্খলার উন্নতিকল্পে পুলিশকে তার পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে আরও দায়িত্বশীল, সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ বিষয়ে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও কেডিএর চেয়ারম্যান এড. শফিকুল আলম মনা জানান, খুলনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে চরম অবনতি ঘটেছে, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে পরিস্থিতি উন্নতির উন্নত খুলনার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, আইনমন্ত্রীর সাথে আমরা মতবিনিময় করেছি। ওই মতবিনিময় সভায় আমি সুস্পষ্ট ভাষায় খুলনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কথা বলেছি। আমাদের দাবি, অবিলম্বে খুলনাকে সন্ত্রাসমুক্ত করা হোক, তার জন্য যা যা করা প্রয়োজন তাই করতে হবে। এ বিষয়ে আড়ংঘাটা থানা অফিসার ইনচার্জ মো.হালিমুর রহমান জানান, আড়ংঘাটা বাইপাস মোড়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে ব্যবসায়ীর অর্থ লুটের অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তপূর্বক আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করবো। এ বিষয়ে দৌলতপুর থানা অফিসার ইনচার্জ মু. মোরাদুল ইসলাম জানান, দৌলতপুর থানার দেয়ানা মোহাম্মাদীয়া মাদ্রাসা এলাকায় গভীর রাতে সশস্ত্র দুর্বত্তদের মহড়ার বিষয়টির ব্যাপারে আমি অবগত হয়েছি, তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেব। এ বিষয়ে কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (উত্তর) সুদর্শন কুমার রায় জানান, গভীর রাতে দলবদ্ধ সশন্ত্র সন্ত্রাসীদের বিষয়ে আমাকে অবগত করা হয়েছে, এছাড়া ওই বিষয়টি আমার দৃষ্টিগোচরও হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধীদের শণাক্তসহ আইনগত পদক্ষেপ গ্রহনসহ অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস প্রদান করেন এ কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button