মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, বিভ্রান্তিকর তথ্য, সাইবার হামলা ও সহিংসতার আশঙ্কায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশটির অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে-এমন আশঙ্কা থেকেই এসব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রায় দুই মাস আগে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার মহড়া দিচ্ছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটকেন্দ্রে ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েন করে ভোটারদের ভয় দেখানো বা ভোটদানে বাধা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মিশিগানে স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার ভোটিং মেশিনে প্রবেশাধিকার চাইলে কীভাবে তা মোকাবিলা করতে হবে। এ ছাড়া দেশজুড়ে ভোটের সরঞ্জাম বা ব্যালট জব্দ, ভোট জালিয়াতির অভিযোগে তদন্ত এবং এসব নিয়ে সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছেন কর্মকর্তারা। রয়টার্স ৫০ জনের বেশি অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মধ্যে ছিলেন ১২ জন স্টেট সেক্রেটারি, যারা নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যের শীর্ষ নির্বাচন কর্মকর্তা। উভয় দলের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকার প্রায় সব কর্মকর্তাই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ভুল তথ্য, সাইবার হামলা ও সহিংসতার হুমকি মোকাবিলায় নতুন কৌশল নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের বড় উদ্বেগ এখন শুধু বিদেশি হস্তক্ষেপ বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসন নিজেই নির্বাচনে ফেডারেল সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেÑএমন আশঙ্কাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী দেশটির নির্বাচন মূলত অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হয়। হোয়াইট হাউস অবশ্য এসব উদ্বেগ নাকচ করেছে। তাদের বক্তব্য, প্রশাসন নির্বাচনী আইন প্রয়োগ এবং ভোটের প্রতি মানুষের আস্থা রক্ষায় কাজ করছে। একই সঙ্গে প্রশাসন ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তবে রয়টার্সের জুলাইয়ের এক অনুসন্ধান ও স্বাধীন বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং তা নির্বাচনের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলার মতো নয়। ট্রাম্প এরই মধ্যে অন্তত ১৫টি এলাকায় নির্বাচনকে ‘জাতীয়ীকরণের’ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ভোট জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তে ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন এবং ডাকযোগে ভোটের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি উইসকনসিন, জর্জিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তা ও কার্যালয় নিয়ে তদন্তও শুরু করেছে তার প্রশাসন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের আসনের সীমানা নতুন করে নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েও দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই চলছে। একই সঙ্গে ভোটারদের জন্মতারিখ, ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর এবং সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের আংশিক তথ্যসহ গোপনীয় তথ্য চেয়ে ফেডারেল সংস্থাগুলো যেসব অঙ্গরাজ্যের কাছে আবেদন করেছে, সেসব নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের একটি অংশ সম্ভাব্য ফেডারেল হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় ব্যক্তিগত আইনজীবী নিয়োগ করছেন। কেউ কেউ কর্মকর্তাদের জন্য আইনি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন। আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনসচেতনতামূলক প্রচার বাড়াচ্ছেন, যাতে ভোটিং মেশিন অবিশ্বস্ত বা ডাকযোগে ভোট দুর্নীতিপূর্ণÑএমন দাবির জবাব দ্রুত দেওয়া যায়। উইসকনসিনের ডেন কাউন্টিতে সম্ভাব্য ভোটিং সরঞ্জাম বা নির্বাচনী নথি জব্দের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তারা উপস্থিত হলে কী করা হবে, তা নিয়েও প্রস্তুতি চলছে। জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টিতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে এফবিআইয়ের অভিযানে ২০২০ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত প্রায় ৬৫০ বাক্স নথি জব্দের ঘটনাও স্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ওই নথি জব্দের বিরুদ্ধে কাউন্টি কর্তৃপক্ষ আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা করে। মে মাসে একটি ফেডারেল আদালত তদন্ত চলাকালে প্রসিকিউটরদের এসব নথি নিজেদের কাছে রাখার অনুমতি দেয়। মিলওয়াকিতেও ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে এফবিআই অন্তত আটজন বর্তমান ও সাবেক কর্মীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের আইনি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করেছে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিনের নির্বাচনী জালিয়াতির মিথ্যা অভিযোগের কারণে হয়রানি ও সহিংসতার আশঙ্কায় বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কোথাও বুলেটপ্রুফ কাচ ও দরজা বসানো হয়েছে, কোথাও প্যানিক বাটন, সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী ও নজরদারি ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। নর্থ ক্যারোলাইনার ডারহাম কাউন্টির নির্বাচন পরিচালক ডেরেক বোয়েন্স জানিয়েছেন, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য তিনি প্রথমবারের মতো আগ্নেয়াস্ত্র নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার কার্যালয়ে ইতোমধ্যে বুলেটপ্রুফ কাচ, নিরাপত্তা দরজা, প্যানিক বাটন ও সশস্ত্র প্রহরী যুক্ত করা হয়েছে। এদিকে ভোট নিয়ে ভুল ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর আশঙ্কাও বড় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য কয়েকটি পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছেÑযেমন ভোটকর্মী ব্যালট নষ্ট করছেন এমন ভুয়া ভিডিও, এআই চ্যাটবটের মাধ্যমে বানানো মিথ্যা সংবাদ এবং ভোটকেন্দ্র পরিবর্তন বা ভোটিং মেশিনে সমস্যা হয়েছে বলে ভোটারদের কাছে পাঠানো ভুয়া বার্তা। কর্মকর্তাদের মতে, এআইয়ের কারণে মিথ্যা তথ্য তৈরি করা এখন সহজ, তা শনাক্ত করা কঠিন এবং দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়েও সতর্ক রয়েছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা। রাশিয়া, চীন ও ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে। তবে এসব দেশ নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। নির্বাচনের সাইবার নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাইবারসিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সি বা সিআইএসএর কার্যক্রমও ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে কমানো হয়েছে। প্রায় এক হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে, যা সংস্থাটির মোট কর্মীর প্রায় ৩০ শতাংশ। নির্বাচনী সাইবার হুমকি নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের একটি প্ল্যাটফর্মের অর্থায়নও বন্ধ করা হয়েছে। পেনসিলভানিয়ার রিপাবলিকান স্টেট সেক্রেটারি অ্যাল শ্মিট সতর্ক করেছেন, এসব পরিবর্তনের গুরুতর পরিণতি হতে পারে। তবে সিআইএসএর এক মুখপাত্র বলেছেন, নির্বাচনের সাইবার নিরাপত্তায় সংস্থাটি পুরোপুরি প্রস্তুত এবং আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এদিকে ট্রাম্পের ডাকযোগে ভোট সীমিত করার একটি পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার আগেই মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আটকে দিয়েছে। ওই পরিকল্পনায় অঙ্গরাজ্যগুলোকে ডাকযোগে ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের তালিকা ফেডারেল সরকারের কাছে দিতে এবং নির্দিষ্ট ধরনের খাম ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল। এক হুইসেলব্লোয়ার সতর্ক করেছিলেন, এতে বৈধভাবে দেওয়া হাজার হাজার ভোটও ভুলভাবে বিলম্বিত বা বাতিল হতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্প গত সপ্তাহে ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তী নির্বাচনসংক্রান্ত সম্মেলনে সমর্থকদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন, যেখানে তিনি ‘প্রয়োজনে যেকোনোভাবে’ ভোট দেওয়ার এবং নিবন্ধিত না থাকলেও ভোট দেওয়ার কথা বলেন। এসব বক্তব্য ও প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সূত্র: রয়টার্স।


