১৯২৮ থেকে ‘হাজার শহীদের কাপ’: গাজার ধ্বংসস্তূপে ফের ফুটছে ফুটবলের ফুল

প্রবাহ স্পোর্টস ডেস্ক ঃ তিন বছরের স্থগিতাদেশের পর গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননের ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোতে আবারও ক্লাব ফুটবল ফিরেছে। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএফএ) আগস্টে জানিয়েছিল, সেপ্টেম্বর থেকে এসব অঞ্চলে ক্লাব ফুটবল পুনরায় শুরু হবে। সেই প্রত্যাবর্তনের প্রথম আয়োজনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘হাজার শহীদের কাপ’। ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের সময় নিহত ১ হাজার ১৪ জন ক্রীড়াবিদ, কোচ, রেফারি ও কর্মকর্তার স্মরণে এই টুর্নামেন্টের নামকরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পিএফএ। ব্রিটিশ শাসনামলে ফিলিস্তিনের ফুটবলের শুরু ঃ ফিলিস্তিনের ফুটবলের ইতিহাস শুরু ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলে। সে সময় ম্যান্ডেট প্যালেস্টাইনে একটি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয় এবং পরের বছর সেটি ফিফার সদস্যপদ পায়। তখন ওই সংগঠনে আরব ও ইহুদি ক্লাবের পাশাপাশি অঞ্চলটিতে কর্মরত ব্রিটিশ সেনা ও পুলিশ সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী ক্লাবও ছিল। ১৯৩৪ সালে প্রতিনিধিত্বের অভাবের অভিযোগ তুলে আরব সদস্যরা সংগঠনটি ছেড়ে আলাদা ‘আরব প্যালেস্টাইন স্পোর্টস ফেডারেশন’ গঠন করেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পুরোনো ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনটি ‘ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন’-এ পরিণত হয়। ফিলিস্তিনি আরবদের প্রতিনিধিত্বকারী নতুন ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয় ১৯৬২ সালে। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে তাদের আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমান পিএফএ ১৯৯৬ সালে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সদস্য হয় এবং ১৯৯৮ সালে ফিফার সদস্যপদ পায়। একই বছর ফিফা স্বীকৃত ম্যাচে প্রথমবার মাঠে নামে ফিলিস্তিন। প্রীতি ম্যাচে লেবাননের কাছে ৩-১ গোলে হেরেছিল তারা। ঘরহীন এক জাতীয় দল ঃ শুরু থেকেই অন্য যেকোনো ফিফা সদস্য দেশের তুলনায় ভিন্ন ধরনের বাধার মুখে পড়েছে ফিলিস্তিন জাতীয় ফুটবল দল। গাজায় আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন প্রায়ই নিরাপত্তাজনিত কারণে অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই নিজেদের ‘হোম’ ম্যাচ পশ্চিম তীরের আল-রাম শহরের ফয়সাল আল-হুসেইনি আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে আয়োজন করে তারা। ফিলিস্তিনের খেলোয়াড়েরা চিলি, সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা ফিলিস্তিনি প্রবাসী এবং অধিকৃত ভূখ- থেকে আসেন। ইসরায়েলের চলাচলসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে গাজাভিত্তিক অনেক খেলোয়াড়ের অনুশীলন ক্যাম্প কিংবা ম্যাচে যোগ দেওয়াও প্রায়ই সম্ভব হয় না। ২০২৪ সালের নভেম্বরে পিএফএ সভাপতি জিবরিল রাজুব বলেছিলেন, ‘আমাদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ, ইসরায়েলিদের শ্বাসরুদ্ধকর নীতিগুলো সবকিছুকে অচল করে দিয়েছে। আমরা জাতীয় লিগসহ সবকিছু স্থগিত করেছি। তারপরও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অব্যাহত রাখার বিষয়ে আমরা দৃঢ় ছিলাম।’ এত বাধার মধ্যেও ফিলিস্তিন জাতীয় দল, যাদের বলা হয় ‘লায়ন্স অব কেনান’, আন্তর্জাতিক ফুটবলে কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। ২০১৪ সালের এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপের ফাইনালে ফিলিপাইনকে হারিয়ে শিরোপা জেতে ফিলিস্তিন। এর মাধ্যমে ২০১৫ এএফসি এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে তারা, যা ছিল ওই প্রতিযোগিতায় তাদের প্রথম অংশগ্রহণ। এরপর ২০২৩ এশিয়ান কাপে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোতে ওঠে ফিলিস্তিন, যা এখন পর্যন্ত তাদের সেরা সাফল্য। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর কয়েক মাস পর কাতারে অনুষ্ঠিত ওই টুর্নামেন্টে দলের কয়েকজন খেলোয়াড় পরিবারের সদস্যদের হারিয়েও মাঠে খেলেছিলেন। যুদ্ধের ধাক্কায় থেমে যায় ফুটবল ঃ ২০০৭ সাল থেকে অবরুদ্ধ গাজায় ফুটবল ছিল জনজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আগের বিভিন্ন সংঘাতের মধ্যেও গাজা স্ট্রিপ প্রিমিয়ার লিগ চালু ছিল। ইত্তিহাদ খান ইউনিস, খাদামাত রাফাহ ও শাবাব খান ইউনিসের মতো ক্লাবগুলোর ছিল স্থানীয়ভাবে বড় সমর্থকগোষ্ঠী। গাজা সিটির প্যালেস্টাইন স্টেডিয়াম ছিল ওই অঞ্চলের প্রধান ফুটবল ভেন্যু। ২০১৪ সালের সংঘাতে স্টেডিয়ামটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী সংঘাতেও এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করলে ফিলিস্তিনি ফুটবল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই থমকে যায়। পিএফএ সব ধরনের প্রতিযোগিতা স্থগিত করে। পিএফএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ক্রীড়াঙ্গনের ১ হাজারের বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে খেলোয়াড়, কোচ, রেফারি, প্রশাসক ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট কর্মীরা রয়েছেন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় ২৬৫টি ক্রীড়া স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে ফুটবল মাঠ, জিমনেশিয়াম, ক্লাব ভবন ও স্টেডিয়াম রয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক তারকা সুলেইমান আল-ওবেইদ এবং অলিম্পিক কোচ হানি আল-মাসরি। ‘হাজার শহীদের কাপ’ শুরুর কয়েক দিন আগে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন আবদেল ফাত্তাহ আবু আল-আইশ। টুর্নামেন্টে খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় নিহত ৫৬০-এর বেশি ফুটবলার, কোচ ও স্টাফের একজন তিনি। ইয়ামুক স্টেডিয়াম, প্যালেস্টাইন স্টেডিয়াম ও আল-দুররা স্টেডিয়ামের মতো কয়েকটি প্রধান ভেন্যু এখন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপেই অনুশীলন ঃ গাজা সিটির ক্ষতিগ্রস্ত প্যালেস্টাইন স্টেডিয়ামের ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই অনুশীলন করছে ‘গাজা আল-ইরাদা’ ক্লাব। আরবিতে ‘ইরাদা’ শব্দের অর্থ ইচ্ছাশক্তি। দলের কয়েকজন খেলোয়াড় যুদ্ধের সময় অঙ্গ হারিয়েছেন, কেউ কেউ ক্রাচে ভর দিয়েও অনুশীলন করছেন। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরেও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে অনুশীলনের জায়গা তৈরি করেছে পিএফএ। বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক ভবনের পাশে কংক্রিটের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করে পুরোনো কৃত্রিম ঘাস বিছানো হয়েছে এবং চারপাশে বেড়া দেওয়া হয়েছে। সেখানেই অঙ্গহারা খেলোয়াড়েরা আবার অনুশীলন শুরু করেছেন। সম্প্রতি স্থানীয় কয়েকটি ক্লাব সেখানে ম্যাচও খেলেছে। তবে ‘হাজার শহীদের কাপ’ আয়োজনও সহজ ছিল না। ড্রপ সাইট নিউজকে এক সহকারী কোচ জানিয়েছেন, প্রতিদিনের ইসরায়েলি বিমান হামলা ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে অনুশীলন বাতিল করতে হয়েছে। এমনকি গাজার খেলোয়াড়েরা আদৌ টুর্নামেন্টে উপস্থিত হতে পারবেন কি না, সেটিও অনিশ্চিত ছিল। এরপরও টুর্নামেন্টে ২০০টির বেশি ক্লাব নিবন্ধন করেছে। এর মধ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ১৪৬টি, গাজার ৪৪টি এবং লেবাননের ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরের ৩৬টি ক্লাব রয়েছে। তিনটি অঞ্চলে একই সময়ে শুরু হয়েছে টুর্নামেন্ট। পিএফএ সভাপতি জিবরিল রাজুব বলেছেন, যুদ্ধ ‘সব ফিলিস্তিনির জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যার ফলে আমাদের প্রতিযোগিতা ও কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়েছিল।’ তবে তার ভাষায়, ‘আমরা আমাদের ফিলিস্তিনি জাতীয় চেতনা হারাইনি। খেলাধুলা আশা ও জীবনের প্রতীক হয়ে থাকবে, এই বিশ্বাসও হারাইনি।’



