ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’

আঘাত হানতে পারে যেসব অঞ্চলে
প্রবাহ রিপোর্ট : চলতি বছরে উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম ঘূর্ণিঝড় আগামী সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে সম্ভাব্য সিস্টেমটি নি¤œচাপ পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি শক্তিশালী হয়ে দক্ষিণ ওডিশা ও উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তবে বাংলাদেশের দিকে সরাসরি এগিয়ে আসা বা দেশে আঘাত হানার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির নাম ‘অর্ণব’ হতে পারে বলে জানা গেছে।
ভারতীয় আবহাওয়ার বিভিন্ন পূর্বাভাসে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আগামী ২১ সেপ্টেম্বরের দিকে নি¤œচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। তখন এর নাম হতে পারে ‘অর্ণব’। তবে নি¤œচাপটি পুরোপুরি গঠিত হওয়ার পর স্থানীয় বায়ুম-লীয় ও সমুদ্রের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এর শক্তি, গতিপথ ও সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যাবে।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর উত্তর থাইল্যান্ডের ওপরের বায়ুম-লে একটি ঘূর্ণিঝড়সদৃশ ঘূর্ণন শনাক্ত করা হয়েছে। এটি ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার দিকে উত্তর আন্দামান সাগরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর ওই ঘূর্ণন থেকে উত্তর আন্দামান সাগর এলাকায় ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি একটি নি¤œচাপ এলাকা তৈরি হতে পারে।
নি¤œচাপটি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। প্রাথমিক পূর্বাভাসে এর সম্ভাব্য গতিপথ দক্ষিণ ওডিশা ও উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে নির্দেশ করছে। ফলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সরাসরি আঘাতের আশঙ্কা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে বঙ্গোপসাগরে কোনো নি¤œচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ গঠনের পরও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়ার বিভিন্ন পূর্বাভাসেও সম্ভাব্য এই সিস্টেমের বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আবহাওয়াবিষয়ক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইউরোপীয় মধ্যমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্যভিত্তিক পূর্বাভাসে ২৩ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরের দিকে বঙ্গোপসাগরে একটি ঘূর্ণিঝড়সদৃশ সিস্টেম গঠনের সম্ভাবনা দেখা গেছে। সম্ভাব্য ঝড়টির কেন্দ্র কিছুটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিকৃত আকৃতির হতে পারে বলেও পূর্বাভাসে ইঙ্গিত রয়েছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার তথ্যভিত্তিক পূর্বাভাসেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ কেন্দ্রবিশিষ্ট একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। দুটি পৃথক পূর্বাভাস ব্যবস্থায় সম্ভাব্য একটি দুর্বল ও কিছুটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘূর্ণিঝড়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও পূর্বাভাসে পরিবর্তন অব্যাহত রয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে সম্ভাব্য ঝড়টির চূড়ান্ত গতিপথ বা তীব্রতা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
ঘূর্ণিঝড়টি যদি সৃষ্টি হয় এবং ‘অর্ণব’ নাম ধারণ করে, তবে এটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’-এর পর উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্টি হওয়া প্রথম ঘূর্ণিঝড় হতে পারে। ‘ডিটওয়াহ’-এর প্রভাবে শ্রীলঙ্কা ও ভারতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে কম ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন এবং অক্টোবর থেকে নভেম্বরকে বাংলাদেশের প্রধান ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সেপ্টেম্বরেও বাংলাদেশের উপকূলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার নজির রয়েছে।
ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তারা দেখিয়েছেন, ১৯৯৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে, বিশেষ করে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ভোলা অঞ্চলে একটি তীব্র সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। ওই ঝড়ে ঘণ্টায় প্রায় ১২৫ থেকে ১৫০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বয়ে যায় এবং ৭ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়। এতে বহু ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বেশ কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে।
এরও আগে, ১৮৩৯ সালের ১৯ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবন উপকূল বরাবর কলকাতা ও বরিশালের মধ্যবর্তী এলাকায় একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল বলে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
সর্বশেষ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরেও বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় ‘গুলাব’ সৃষ্টি হয়েছিল। এটি সরাসরি বাংলাদেশে আঘাত না হানলেও এর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় আবহাওয়া উত্তাল হয়ে ওঠে এবং ভারী বৃষ্টিপাত হয়।
বর্তমানে সম্ভাব্য ‘অর্ণব’ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নি¤œচাপটির গঠন, বিস্তার, শক্তি বৃদ্ধি এবং গতিপথের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা। সমুদ্রের তাপমাত্রা, বাতাসের গতি ও দিক এবং বায়ুম-লের অন্যান্য পরিস্থিতি ঝড়টির ভবিষ্যৎ গতিপথ ও শক্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: ডাউন টু আর্থ ও নিউজ ডেস্ক



