স্থানীয় সংবাদ

শিশুদের সঙ্গে নিয়েই জলবায়ু পরিকল্পনা তৈরির আহবান

খুলনায় দু’ দিনব্যাপী ৬ষ্ঠ শিশু জলবায়ু সম্মেলন শুরু :

স্টাফ রিপোর্টার : ‘জলবায়ু সহনশীলতার জন্য শিশু নেতৃত্ব’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে খুলনায় শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ৬ষ্ঠ বার্ষিক উপকূলীয় শিশু জলবায়ু সম্মেলন। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় অভিযোজনের অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিশুদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) খুলনার সিএসএস আভা সেন্টারে জাগ্রত যুব সংঘ (জেজেএস) ও উপকূলীয় জলবায়ু শিশু ফোরামের (কেএনএইচ) উদ্যোগে এ সম্মেলন শুরু হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় মানুষের দুর্ভোগ নতুন নয়। গত ৩০-৪০ বছর ধরে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য দুর্যোগের পর একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্বাসনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূল থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে খুলনা শহরে আসা মানুষ বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সেখানে শিশুদের শিক্ষা, স্যানিটেশন, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ বাসস্থানের সংকট রয়েছে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিকল্প কর্মসংস্থান, লবণসহিষ্ণু ফসল উৎপাদন, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রয়োজন।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু আরও বলেন, দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়া হলেও তা স্থায়ী পুনর্বাসনের বিকল্প নয়। অতীতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসন কার্যক্রম নেওয়া হলেও সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে হয়নি। তাই ভবিষ্যতে পুনর্বাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত ও টেকসই উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকায় অনেক সাইক্লোন সেন্টার দীর্ঘদিন সংস্কারহীন অবস্থায় পড়ে আছে। পর্যাপ্ত স্যানিটেশন, যোগাযোগব্যবস্থা ও অন্যান্য সুবিধার অভাবে দুর্যোগের সময় এসব আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও আস্থাও বাড়াতে হবে।
শিশুদের ভূমিকার বিষয়ে তিনি বলেন, শিশুরা এখন শুধু সমস্যার কথা বলতে চায় না, তারা সমাধানের অংশীদার হতে চায়। তাদের পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতাকে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় শুধু সেমিনার বা আলোচনা নয়, এসব সুপারিশ রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শুধু বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর না করে দেশের নিজস্ব অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা দরকার। ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল পুনর্গঠনে নিজস্ব সক্ষমতা ও অর্থায়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সম্মেলনে শিশু প্রতিনিধিরা বলেন, ‘আমরা শুধু সমস্যার কথা বলতে চাই না, সমাধানের অংশ হতে চাই।’ তাদের মতে, জলবায়ু ও দুর্যোগ মোকাবিলায় পরিকল্পনা গ্রহণের সময় শিশুদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের ভাষায়, ‘শিশুদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, শিশুদের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
এ সম্মেলনে উপকূলীয় এলাকার শিশু, শিক্ষাবিদ, পরিবেশকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
আয়োজকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রায় পাঁচ হাজার শিশুর সঙ্গে পরিচালিত কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা সম্মেলনে তুলে ধরা হচ্ছে।
দুই দিনের সম্মেলনে ডিজিটাল স্টোরিটেলিং, পোস্টার উপস্থাপনা, শিশুদের নেতৃত্বে জলবায়ু কার্যক্রম, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের শিশুদের জীবনে জলবায়ু সংকটের প্রভাব, জলবায়ু অর্থায়নে শিশু ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার এবং জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেজেএসের নির্বাহী পরিচালক এটিএম জাকির হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. ফজলুল হক, ডিজাস্টার ফোরামের সদস্য সচিব গওহর নঈম ওয়ারা, ইউনিসেফের প্রতিনিধি কাওসার হোসেন এবং খুলনা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলাম।
সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কোস্টাল চিলড্রেন ফোরামের সদস্য হুমায়রা খাতুন ও চয়ন মৃধা। এরপর সম্মেলনের মূল পটভূমি ও লক্ষ্য তুলে ধরেন জেজেএস-এর নির্বাহী পরিচালক এবং সম্মেলনের সমন্বয়কারী এটিএম জাকির হোসেন।
উদ্বোধনী সেশনে অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন এডিআরআরএন-এর চেয়ারপারসন তাকেশি কোমিনো এবং কেএনএইচ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাটরিন উইডেমান।
সম্মেলনে উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুদের জলবায়ু ঝুঁকি ও দুর্ভোগ নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন কোস্টাল চিলড্রেন ফোরাম অন ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর সাধারণ সম্পাদক নূর আহমদ জিদান এবং উপকূলীয় শিশুদের জলবায়ু বিষয়ক অ্যাডভোকেসি তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি নওশীন ইসলাম।
অনুষ্ঠানে উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট ও লবণাক্ততার প্রভাব বিষয়ে কারিগরি তথ্য ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী।
দিনের প্রথমার্ধে অতিথিদের বক্তব্যের পর ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস মেলা’ উন্মুক্ত করা হয়। মধ্যাহ্নভোজের পর শিশুদের আয়োজিত প্ল্যাটফর্মগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে অনুষ্ঠিত বিশেষ আলোচনা পর্বে সঞ্চালনা করেন গওহার নঈম ওয়ারা। এতে মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. জাকির হোসেন।
আলোচক হিসেবে অংশ নেন কোস্টাল চিলড্রেন ফোরামের সদস্য নীরব হাসান ও তায়েবা আক্তার, কেএনএইচ বাংলাদেশের প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর হেনরি হেবল রায়, শিক্ষাবিদ ও লেখক ড. দিপু মাহমুদ এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর খুলনার উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সুরাইয়া সিদ্দিকা।
বিকেলের সেশনে ডিজিটাল স্টোরিটেলিং এবং শিশুদের জলবায়ু কার্যক্রমের ওপর পোস্টার উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়। বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ব্লাস্ট খুলনা ইউনিটের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট অশোক কুমার সাহা, দৈনিক আমার দেশ-এর খুলনা ব্যুরো প্রধান এহতেশামুল হক শাওন, কালের কণ্ঠের খুলনা ব্যুরো প্রধান এইচ এম আলাউদ্দিন এবং সাংস্কৃতিক কর্মী নেওয়াজ আহমেদ তুহিন।
প্রথম দিনের কর্মসূচি শেষ হয় কোস্টাল চিলড্রেন ফোরামের সদস্য সাহারা রহমান ও নীরব হাসানের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন আজ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ হবে। সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে শিশু প্রতিনিধিরা ‘সুরক্ষা, অংশগ্রহণ ও শিশুদের জলবায়ু কার্যক্রমের স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণে উপকূলীয় শিশুদের দাবি’ তুলে ধরবেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button