স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় বিএল কলেজে ছাত্রশিবিরের নবীন বরণ

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়
জনগণের মেধা ও মানবসম্পদকে গড়ে তোলা
–নূরুল ইসলাম সাদ্দাম
ভারতের আধিপত্যের প্রভাব থাকার কারণে অর্থনীতিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল রাখা হচ্ছে
–শিবির সভাপতি

খবর বিজ্ঞপ্তি ঃ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, জনগণের মেধা ও মানবসম্পদকে গড়ে তোলা। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের মেধাবী তরুণদের জন্য শিক্ষা, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশে সে ধরনের পরিকল্পিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খুলনা বিএল কলেজ ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে কলেজ অডিটোরিয়ামে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নবীন বরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ সব কথা বলেন।
কলেজ ছাত্রশিবির সভাপতি মাহী চৌধুরীর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী, খুলনা মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি রাকিব হাসান, সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস শেখ কামরুল আলম, সাবেক মহানগর সভাপতি মুকাররম বিল্লাহ আনসারী, আজিজুল ইসলাম ফারাজী, মুশাররফ আনসারী, জাহিদুর রহমান নাঈম, আরাফাত হোসেন মিলন, জামায়াত নেতা আল ফিদা হোসেন, বিএল কলেজ ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মনসুর আলম চৌধুরী, সাইদুর রহমান, মহানগর ছাত্রশিবিরের বায়তুলমাল সম্পাদক কামরুল হাসান, প্রচার ও এইচআরডি সম্পাদক এস এম বেলাল হোসেন, কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হযরত আলী, তথ্য সম্পাদক সেলিম বিন আব্দুস সালাম, শিক্ষা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হাফেজ মহিব্বুল্লাহ।
কলেজ ছাত্রশিবির সেক্রেটারি আবুল কাসেমের পরিচালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন ও উপস্থিত ছিলেন বিএল কলেজ ছাত্রশিবিরের দপ্তর সম্পাদক মোখলেছুর রহমান মিরাজ, এইচআরডি সম্পাদক নাফিস সাদিক, সাহিত্য সম্পাদক তহিদুজ্জামান রনি, সহকারী দপ্তর সম্পাদক আমিনুর ইসলাম, আবু মোস্তফা কামাল, শেখ আবুল হাসান, ইস্তিয়াক আহমেদ, খান ফারদিন আহম্মেদ, আসাদুল্লাহ আল গালিব, নুরুল ইসলাম বুলবুল, মুশফিক ফয়সাল, আসাদুল্লাহ আল গালিব, এস কে রায়হান প্রমুখ।
পরে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা করেন প্রত্যাশা সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ। নবীন বরণ অনুষ্ঠানে ক্যারিয়ার সেশন, সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের আল কুরআন, ফুল, বই, ফোন স্ট্যান্ড, স্টিকার, বুকমার্ক, শুভেচ্ছা কার্ড, স্ন্যাকসসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে অতিথিদের বক্তব্যের পাশাপাশি নবীন শিক্ষার্থীরাও অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
নবীন বরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাস নানন্দিক তোরণ, ফেস্টুন, প্লাকার্ড, ফটো বুথসহ নানা আয়োজনে ক্যাম্পাস সুসজ্জিত করা হয়। এসব ফেস্টুন-প্লাকার্ডে নবীনদের শুভেচ্ছাবার্তার পাশাপাশি ইসলামের মৌলিক বিষয়, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া, ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক পরিচিতিসহ বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও ফ্যাসিস্ট আমলে শাহাদাত বরণকারী ব্যক্তিত্ব ও জুলাই শহীদদের প্রদর্শনী করা হয়।
প্রধান অতিথি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, বিভিন্ন দেশে অর্থনীতি ও অন্যান্য বিষয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে রাজনীতিতে আমলাদের বদলে রাজনীতিবিদদের নেতৃত্ব দেওয়ার অন্যতম কারণ দেশটি মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিদের রাজনীতিতে নিয়ে আসে।
তিনি বলেন, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ তাদের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা বের হওয়ার পর তাঁদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে ।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসএসসি পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলেও তাঁদের নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত পরিকল্পনা নেই। যারা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আবারও এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ থাকা উচিত ।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, জনগণের মনন, মেধা ও দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করাই একটি রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর ভারতের আধিপত্যের প্রভাব রয়েছে এবং এ কারণে দেশের অর্থনীতিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল রাখা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে দাবি করেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলে এসব রাজ্য ভারতের বাইরে গিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের আগ্রহ দেখাতে পারে। এ কারণেই র এর এজেন্টরা বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বড় আকারের সরকারি বৃত্তি চালুর প্রস্তাব দেন নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেন, সরকার চাইলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য অর্থায়ন করতে পারে। মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় বাজেট বরাদ্দ দিয়ে বিদেশে পড়াশোনা শেষে তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদে বিনিয়োগ না করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য শিক্ষার্থীদের অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের প্রসঙ্গে ছাত্রশিবির সভাপতি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় দলীয় বিবেচনায় নম্বর দেওয়ার মাধ্যমে নিয়োগে বৈষম্য করা হয়েছে। তাঁর দাবি, দলীয় পরিচয় না থাকলে কিংবা মাদরাসা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়া হতো।
বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমানোর দাবিতে ছাত্রশিবির আন্দোলন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি বলেন, লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাইয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বর্তমান সরকারের আমলেও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেন, চাকরির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দলীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনা গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের করের টাকায় সরকারি চাকরির বেতন দেওয়া হয়, তাই নিয়োগের ক্ষেত্রেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।
পুলিশি যাচাই-বাছাইয়ের কারণে প্রাথমিকের প্রায় এক হাজার প্রার্থী চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন । তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক আনুগত্য বা স্থানীয় নেতার সুপারিশ না থাকাকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাকরি না দেওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তরুণদের বেসরকারি চাকরি ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি চাকরি সীমিত। তাই ইংরেজি, আইইএলটিএস, জিআরই, প্রোগ্রামিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল মার্কেটিং, যোগাযোগ দক্ষতা ও গবেষণার মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ছাত্রশিবির থ্রাইভ এন জেন নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে বলেও জানান তিনি। তাঁর দাবি, সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি, আইইএলটিএস, গবেষণা পদ্ধতি ও বিভিন্ন সফট স্কিলের কোর্স থাকবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এসব সুবিধা পাবে বলে জানান তিনি।
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চার বছরকে নিজেদের গড়ে তোলার সময় হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। প্রথম বর্ষ থেকেই চাকরি কিংবা উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি শুরু করলে ভবিষ্যতে ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশ হতে হবে না।
শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে তরুণদের মধ্যে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ধূমপানসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রবণতা বাড়ছে। এসব থেকে দূরে থেকে নিজেদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে যোগ্যতা ও চরিত্রের কারণে সমাজে তাঁদের প্রয়োজন তৈরি হয়।
তিনি বলেন, শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য নয়, মৃত্যুর পর দেশ ও সমাজে নিজের অবদান কী থাকবেÑতরুণদের সেই প্রশ্নও করতে হবে। চরিত্র ও নৈতিকতা হারালে জীবনের অন্যান্য অর্জন অর্থহীন হয়ে পড়ে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি শিক্ষার্থীদের সময়ের সদ্ব্যবহার, দলগতভাবে পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষ্য, প্রথম বর্ষ থেকেই নিয়মিত পড়াশোনা, দক্ষতা অর্জন ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করলে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। প্রধান অতিথি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধ কমেনি। তাঁর দাবি, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের নৈতিকতা ও মানবিকতা নিশ্চিত করতে পারে না; ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষারও প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষণ, লুটপাট ও চাঁদাবাজি কমার কথা ছিল। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার হার বাড়লেও এসব অপরাধ কমেনি। শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও দুর্নীতি বেড়ে গেছে । ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদন প্রসঙ্গে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় এই সভাপতি বলেন, শিক্ষা খাত দুর্নীতির দিক থেকে বিভিন্ন সময় শীর্ষ অবস্থানে থাকে। শিক্ষা খাতে সরকার যে বরাদ্দ দেয়, তার একটি বড় অংশ দুর্নীতির কারণে যথাযথভাবে ব্যবহার হয় না।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button