রংপুর বিভাগের উন্নয়নে রাজপথে সোচ্চার হতে চান জামায়াতের এমপিরা

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ রংপুর বিভাগের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে সংসদের পাশাপাশি রাজপথে সোচ্চার হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গ বিশেষ করে রংপুর বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে এ অঞ্চলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও পৃথক উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর মহানগরীর শাপলা চত্বরে জামায়াতে ইসলামীর দলীয় কার্যালয়ে রংপুর বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরামের ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এটিএম আজহারুল ইসলাম এসব কথা বলেন। এ সময় জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সাংবিধানিক সংস্কারের জোর দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর বিভাগ থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যগণ, রংপুর মহানগর জামায়াতের আমির এটিএম আজম খানসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
রংপুর বিভাগের উন্নয়নে ১৩টি দাবি তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন; দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির দ্বিতীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন; সৈয়দপুর বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন; দ্বিতীয় যমুনা সেতু দ্রুত নির্মাণ; রংপুর বিভাগের রাস্তাঘাট, সেতু ও কালভার্টসহ অবকাঠামোর বিশেষ উন্নয়ন; বিভাগের উপজেলাগুলোতে সরকারি মহিলা কলেজ স্থাপন; নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ; রংপুর বিভাগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা; রংপুরে গ্যাস সরবরাহ চালু; রেল যোগাযোগ আধুনিকায়ন ও ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি; সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা; রংপুর অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, বিভাগের সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আধুনিকায়ন ও রংপুর মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীতকরণ এবং সকল জেলা শহরকে জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, রংপুর বিভাগকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে নিতে এসব দাবির বাস্তবায়ন করতে হবে। এই দাবি আমাদের দলের কিংবা ফোরামের নয়, রংপুর বিভাগের দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের দাবি এগুলো। এজন্য রংপুর বিভাগের উন্নয়নে শুধু সাধারণ বরাদ্দ নয়, বঞ্চনার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে ‘ইনসাফপূর্ণ’ বণ্টন প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন সেই অবস্থান অনেকটা নরম হয়ে এসেছে। কোনো বিদেশি চাপের কারণে প্রকল্পটি থেকে সরে আসা হলে রংপুরের মানুষ তা মেনে নেবে না।
মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির দ্বিতীয় প্রকল্প প্রসঙ্গে আজহারুল ইসলাম বলেন, দেশে হার্ডরকের চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন খুবই কম। দ্বিতীয় খনি বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আনার সুযোগ তৈরি হবে। সৈয়দপুর বিমানবন্দর বর্তমানে বিমান চলাচল বাড়লেও বিমানবন্দরের সক্ষমতা সীমিত। উত্তরাঞ্চলের মানুষের ঢাকা ও দেশের বাইরে যাতায়াতের কথা বিবেচনায় নিয়ে বিমানবন্দরটির আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
এ সময় রেল যোগাযোগ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। দ্রুতগতির ট্রেন চালু, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো এবং সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকে কার্যকর করার দাবি জানান।
উন্নয়ন বৈষম্য প্রসঙ্গে এই সংসদ সদস্য বলেন, অবহেলিত রংপুর বিভাগের উন্নয়ন কোনো একক দলের দাবি নয়। এটি আমাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয়ও নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার। রংপুরের মানুষ শুধু ‘সমান অধিকার’ চান না; বরং পিছিয়ে থাকা এ অঞ্চলের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি বরাদ্দ চান। এমনকি একই পরিমাণ বরাদ্দ দিলেও পিছিয়ে থাকা রংপুর কখনোই সেই ব্যবধান পূরণ করতে পারবে না। এ কারণে রংপুর বিভাগের জন্য বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
উন্নয়নের আকাঙ্খা পূরণে প্রয়োজনে দাবি বাস্তবায়নে রাজপথে সবাইকে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন আরও বলেন, রংপুর বিভাগের বিপুল জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার। এ অঞ্চলের মানুষকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই ন্যায্য নয়।
আজহারুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, দেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা অর্থ বা সম্পদের ঘাটতি নয়; বরং দুর্নীতি ও অযোগ্য নেতৃত্ব। এ ক্ষেত্রে তিনি অতীতে প্রকাশিত অর্থ পাচার সংক্রান্ত বিভিন্ন হিসাবের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো সনদের বিভিন্ন দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেও পরবর্তী সময়ে এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ২১০টি আসন পায় এবং জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে আসে। একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।
তিনি দাবি করেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নকে জটিল করেছে। সংসদে এর সমাধান না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সাত্তার, ২ আসনের আল ফারুক আব্দুল লতিফ, ৩ আসনের ওবায়দুল্লাহ সালাফী, ৪ আসনের আব্দুল মুত্তাকিম, রংপুর-১ আসনের রায়হান সিরাজী, ৩ আসেনর মাহবুবুর রহমান (বেলাল), ৫ আসনের গোলাম রব্বানী, কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম, ৪ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান, গাইবান্ধা-১ আসনের মাজেদুর রহমান, ২ আসনের আব্দুল করিম, ৩ আসনের আবুল কাওছার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম লেবু এবং ৫- আব্দুল ওয়ারেছসহ জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।



