নেপথ্যে আধিপত্য ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো বিরোধ, মামলায় হুমকির আসামি ৪, ওসি বদলি

খুলনায় ‘জনযুদ্ধ’ নেতা নাসিম হত্যা
জামান ফকির : খুলনার দিঘলিয়ায় নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠন ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)’–এর আঞ্চলিক নেতা চাঞ্চল্যকর নাসিমুল গনি ওরফে নাসিম কিলিং মিশনের ঘটনায় ৭ থেকে ৮ জন অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার রাতে নিহতের স্ত্রী মোছাঃ সেলিনা খাতুন বাদী হয়ে দিঘলিয়া থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৭-৮ জনের কথা উল্লেখ করলেও জীবদ্দশায় হত্যার হুমকিদাতা ৪জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, মামলায় পূর্ব শত্রুতার কথা উল্লেখ করে আধিপত্য বিস্তার ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো বিরোধের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।
এদিকে, হত্যাকা-ের একদিনের মধ্যেই তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে দিঘলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার সানোয়ার হুসাইন মাসুমকে। নতুন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুলিশ পরিদর্শক অরূপ কুমার চৌধুরীকে। যদিও বিষয়টিকে ক্লোজ না বলে জনস্বার্থে বদলি বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক।
যেভাবে বাস্তবায়ন হয় কিলিং মিশন : এজাহার ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর সকাল আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে তৈয়ব আলীর দোকানে চা খাচ্ছিলেন নাসিমুল। এ সময় হঠাৎ একটি ভ্যানে করে আসা দুই চরমপন্থি ক্যাডার তাকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি বর্ষণ করে। জীবন বাঁচাতে পাশে থাকা ফেরদৌসের ভ্যান চার্জের গ্যারেজে প্রবেশের চেষ্টা করলে আততায়ীরা ধাওয়া করে অতি কাছ থেকে তার মাথায় ও শরীরে পর পর কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। গুলির শব্দে নিহতের স্ত্রী বাড়ির ৩য় তলার বেলকনি থেকে চিৎকার করলে সন্ত্রাসী দুজন দ্রুত ভ্যানে উঠে দৌলতপুর ঘাটের দিকে চলে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় নাসিমকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পূর্বশত্রুতার সূত্র : অনুসন্ধানী সূত্র ও পরিবারের দাবি, অঞ্চলভিত্তিক আধিপত্য, জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও চরমপন্থি উপদলের পুরোনো শত্রুতার জেরে দৌলতপুরের জুমন শেখ (৩৫), মোঃ রায়হান মোল্যা (৩০), রিপন ওরফে অ্যালকো রিপন (৪২) ও শরিফুল বিহারী (৪৫)-সহ কয়েকজনের সাথে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল নাসিমুলের। তিনি পূর্বেই নিজ প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। ওই বিরোধের জের ধরেই পেশাদার খুনিদের দিয়ে এই পরিকল্পিত কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে নিহতের পরিবার দাবি করেছে। নিহত নাসিমুল একসময় অঞ্চলের আলোচিত চরমপন্থি দল ‘জনযুদ্ধ’-এর সক্রিয় আঞ্চলিক নেতা ছিলেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা ও অস্ত্র মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি এলাকায় ফিরে এসে জমি ব্যবসায় যুক্ত হন। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত হন।
ভ্যানে আসা ২ যুবক সিসিটিভি ফুটেজে চিহ্নিত : নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম হত্যাকা-ের ঘটনায় তদন্তে নতুন অগ্রগতি এসেছে। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছে যে, একটি ব্যাটারিচালিত/সাধারণ ভ্যানে চড়ে এসে দুষ্কৃতকারীরা এই হত্যাকা- ঘটিয়ে একই ভ্যানে করে পালিয়ে যায়।
সংগৃহীত সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বিবরণ থেকে দেখা গেছে, চায়ের দোকানে নাসিম যখন অবস্থান করছিলেন, তখন ভ্যানে চড়ে আসা দুই যুবক সেখানে নামে। তাদের একজন কাছ থেকে তার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি চালায়। হত্যাকা- সংঘটিত করার পরই তারা আবার একই ভ্যানে উঠে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার কাজ জোরদার করা হয়েছে এবং হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে এই হত্যাকা- ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
তাৎক্ষণিক বদলি হলেন ওসি : এদিকে, নাসিমুল গনি ওরফে নাসিম হত্যাকা-ের পর থানা প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকা-ের পর দিঘলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাওলাদার সানওয়ার হোসাইন মাসুমকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে খুলনা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত (বদলি) করা হয়েছে। একই সাথে দিঘলিয়া থানার নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অরূপ কুমার চৌধুরীকে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে খুলনা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) সরকার ওমর ফারুক জানান, প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা আনা এবং তদন্ত প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ও ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে জনস্বার্থে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৪ অক্টোবর সকালে দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে তৈয়ব আলীর দোকানে চা পান করার সময় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন নাসিমুল গনি নাসিম। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি চালালে তিনি পাশের একটি গ্যারেজে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। সেখানে তাকে ধরে মাথায় ও পেটে একাধিক গুলি চালিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
পুলিশের তৎপরতা : নবনিযুক্ত ওসি অরূপ কুমার চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণ করেই আসামিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করেছেন।
জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানিয়েছেন, হত্যাকা-ের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত অপরাধী ও পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানার একাধিক টিম সমন্বিতভাবে কাজ করছে। অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও আসামিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শুভ্র প্রকাশ দাস জানিয়েছেন, ঘটনার নেপথ্যে পেশাদার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ কোনো কোন্দল নাকি জমি সংক্রান্ত ব্যবসায়িক বিরোধীতা- সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঘাতকদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে একাধিক টিমের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

